

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে প্রায় রেকর্ড ৯২ শতাংশ ভোটদান হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টি, উভয় পক্ষই ১০০-র বেশি আসন জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।
এরই মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির আহ্বায়ক অনুব্রত মণ্ডলের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, তিনি নাকি বলেছেন যে প্রথম দফায় ১৫২টির মধ্যে তৃণমূল ১৫–১৬টির বেশি আসন পাবে না।

ভাইরাল ক্লিপে অনুব্রত মণ্ডলকে বলতে শোনা যায়, “আমার জীবনে ভাই এমন ভোট দেখি নাই! এই ৯৬-৯৭-৯৮ শতাংশ পোল…১৫২টা আসনে ভোট হল তো? আমি প্রথমে বলেছিলাম ১৩০টা পাবে তৃণমূল কংগ্রেস। ১৫-১৬টা পাবে কিনা সন্দেহ আছে, প্রথম দফায়।”
ভিডিওটি পোস্ট করে কেউ লিখেছেন, “অনুব্রত মণ্ডল বলছেন প্রথম দফার ভোটে তৃণমূল 15 - 16টা সিট পাবে কিনা সন্দেহ....।”
কোনও কোনও পেজ থেকে আবার একই ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “তৃণমূলের হার নিশ্চিত বলছেন স্বয়ং অনুব্রত মন্ডল??”
দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা এই ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করেন, অনুব্রত মণ্ডল বলেছেন তৃণমূল প্রথম দফায় ১৫–১৬টির বেশি আসন পাবে না, এবং এটিকে “বিজেপি সুনামি”-র ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেন।

ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক টিমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিওতে অনুব্রত মণ্ডলের মন্তব্য তৃণমূলের বিরুদ্ধে বলে মনে হলেও, তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্যে স্পষ্ট যে তিনি আসলে বিজেপিকে উদ্দেশ্য করেই এই মন্তব্য করেছিলেন।
সত্য উদ্ঘাটন
আপতভাবে অনুব্রত মণ্ডলের কাছে থেকে এমন মন্তব্য অপ্রত্যাশিত হলেও অনেকেই তা বিশ্বাস করছেন। যার নেপথ্যে রয়েছে অনুব্রতর সঙ্গে দলের সম্পর্কের বিগত কয়েক বছরের ইতিহাস।
একদা মমতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনুব্রতকে ২০২২ সালে সিবিআই গরু পাচার মামলায় অভিযুক্ত করে এবং পরে গ্রেপ্তারও করা হয়। মুক্তির পর থেকে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর থেকে দৃশ্যমান দূরত্ব বজায় রেখেছে। ২০২৫ সালে তিনি আবার শিরোনামে উঠে আসেন বোলপুর থানার ওসি-কে ফোনে গালিগালাজ করার অভিযোগে। সেই কথোপকথন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। একই বছরে তাঁকে জেলা সভাপতির পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় সেই সঙ্গে দলে জেলা সভাপতির পদও তুলে দেওয়া হয়।
চলতি নির্বাচনের প্রচারের সময়ও এক মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনুব্রত মণ্ডলকে রাগে গজগজ করতে করতে মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, যার মধ্যে ছিলেন কাজল শেখও, যিনি দলের অন্দরেই অনুব্রতর বিরোধী শিবিরের বলে পরিচিত।
এইসব সকল ঘটনার প্রেক্ষিতে—এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব নিয়ে জল্পনার কারণে—অনেকেই ভিডিওটি দেখে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে অনুব্রত এমন কথা বলে থাকতে পারেন।
এ ধরনের কোনও মন্তব্য অনুব্রত সত্যিই করেছেন কি না তা যাচাই করতে কিওয়ার্ড সার্চে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া যায়নি।
এরপর আনন্দবাজার পত্রিকায় ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘‘আমার জীবনে ভাই এমন ভোট দেখি নাই! এই ৯৬-৯৭-৯৮ শতাংশ পোল... এত পোল মানে দিদির ফেভারে পড়বে। ১৫২টা আসনে ভোট হল তো? আমি প্রথমে বলেছিলাম ১৩০টা পাবে তৃণমূল কংগ্রেস। এখন ১৫-২০টা বিজেপি পাবে কি না আমার সন্দেহ আছে।’’
এই বক্তব্য ভাইরাল দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। এরপর আমরা মূল ভিডিওটি খুঁজে পাই, যা ‘এই সময়’-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে অনুব্রত মণ্ডলকে বলতে শোনা যায়, “এবার মানুষ নিজেরা বেরিয়ে এসে ভোট দিয়েছে, কাউকে বলতে হয়নি… এত বেশি ভোট আমি জীবনে দেখিনি, আর এত ভোট দিদির পক্ষেই যায়। ১৫২টা সিটে ভোট হয়েছে, আগে বলেছিলাম তৃণমূল ১৩০ পাবে। এখন সন্দেহ হচ্ছে (ওরা) ১৫–১৬টা সিট পাবে কি না।”
পুরো নির্বাচনের আসন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আরও বলেন, “আমি বললাম তো ২৪০-ও হয়ে যেতে পারে। আমি তো ২৩০–২৩৫ বলে আসছি… এসআইআর-এর জন্য বিডিও অফিসে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল বয়স্ক মানুষকে। হয়রানির শেষ করেছিল। কাল রাত পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম তোলা হয়েছে। কতজন মারা গেছেন—সেই আত্মাগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে না! তারা তো বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বলছে তাড়াতাড়ি বেরো, ভোট দে দিদিকে।”
অর্থাৎ, পুরো বক্তব্য শুনলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে অনুব্রত মণ্ডলের ভাইরাল ভিডিওটি আসল প্রেক্ষাপটবিহীন। তিনি ১৫-১৬ আসনের কটাক্ষ বিজেপির উদ্দেশে করেছিলেন।

অনুব্রত মণ্ডল বলেছেন, প্রথম দফার ভোটে তৃণমূল কংগ্রেস ১৫–১৬টির বেশি আসন পাবে না।
ভাইরাল ভিডিওটি প্রেক্ষাপটহীনভাবে শেয়ার করা হয়েছে। অনুব্রত মণ্ডলের সম্পূর্ণ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি ১৫–১৬ আসনের মন্তব্যটি তৃণমূল নয়, বিজেপিকে উদ্দেশ্য করেই করেছিলেন।