

রাত পোহালেই বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা। এই মুহূর্তে কড়া নিরাপত্তায় রাজ্যের বিভিন্ন স্ট্রং রুমে রাখা হয়েছে নির্বাচনে ব্যবহৃত সব ইভিএম। তবে গণনার আগে ইভিএম কারচুপির অভিযোগে সরগরম হয়ে উঠে বাংলার রাজনীতি। বহিরাগত ঢুকিয়ে ইভিএম কারচুপি করা হতে পারে বা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিজেপি ও তৃণমূল উভয় দল। তবে এই কারচুপি রোধে শাসক-বিরোধী উভয় দলের নেতৃত্বের তরফে দলের প্রার্থী ও কর্মীদের প্রতিটি স্ট্রং রুমে কড়া নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে একটি ভিডিও।
যেখানে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইভিএম মেশিনের কারচুপির অভিযোগ খারিজ করতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি, ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘যারা ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁদের কাছে কোনও প্রমাণ থাকলে তাঁদের উচিত নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে তা পেশ করা।’ ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ তোলা হলেও, তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ইভিএম কারচুপির সেই অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন।
উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “দলের অনেকেই কাউন্টিং সেন্টারে গিয়ে ইভিএম পাহারা দিচ্ছেন, তবে দলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইভিএম প্রসঙ্গে কি বললেন শুনুন #westbengalassemblyelection2026।” এই একই ভিডিও শেয়ার করে অপর এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইভিএম নিয়ে এইবার অন্তত অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের কোনও অভিযোগ নেই।” অর্থাৎ উভয় পোস্টের মাধ্যমে ভিডিওটিকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে ইভিএম নিয়ে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের মন্তব্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইভিএম সংক্রান্ত মন্তব্যের ভাইরাল ভিডিওটি সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময়ের নয়। বরং সেটি ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর লোকসভার বাইরের ভিডিও।
সত্য উন্মোচন
প্রথমত, ভাইরাল ভিডিওটি সন্দেহজনক। কারণ বিধানসভা নির্বাচন শেষ হতে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলের একাধিক নেতারা যখন বরংবার বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। আর সেই সময় দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ইভিএম কারচুপির সেই অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে থাকলে সেই সংক্রান্ত খবর অবশ্যই প্রথম শ্রেণির বাংলা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হবে। কিন্তু অনুসন্ধানে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি যা থেকে এর সত্যতা প্রমাণ হয়।
তাই এরপর ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক কি-ফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর The Statesman-র অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইভিএম হ্যাকিংয়ের অভিযোগ খারিজ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রমাণ পেশের আহ্বান জানিয়েছেন।” ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই একই দাবি-সহ ভিডিওটি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে শেয়ার করে ছিলেন বিজেপি নেতা অমিত মালব্যও।
After Omar Abdullah, if even West Bengal Chief Minister Mamata Banerjee’s nephew, who brazenly steals election in Diamond Harbour, using police and state machinery, claims that EVMs can’t be manipulated, then the Congress and Rahul Gandhi are in serious trouble. Their isolation… pic.twitter.com/BlUCdEtQkV
— Amit Malviya (@amitmalviya) December 16, 2024
এরপর উক্ত সূত্র ধরে এই সংক্রান্ত পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে টাইমস অফ ইন্ডিয়া-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর লোকসভার বাইরে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘ইভিএম হ্যাকিং’ সংক্রান্ত কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর তরফে তোলা অভিযোগের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি ইভিএম হ্যাকিংয়ের অভিযোগগুলো খারিজ করে দেন এবং বলেন, “যারা ইভিএম হ্যাকিংয়ের অভিযোগ করছেন, তাঁদের কাছে যদি কোনও প্রমাণ থাকে, তবে তা নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ করা উচিত।" এখানে উল্লেখ্য, অভিষেকের মন্তব্যের ঠিক একদিন আগে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহও ইভিএম কারচুপির বিষয়টি খারিজ করে দিয়েছিলেন।

তবে এখানে উল্লেখ্য, ভোটগণনার আগে গতকাল তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের নিয়ে বৈঠক করেন মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বৈঠকে ইভিএম কারচুপির বিষয় নিয়ে দলের কাউন্টিং এজেন্টদের সতর্ক করেন অভিষেক। এজেন্টদের ভোট গণনার সময় একেবারে সামনের সারিতে বসার নির্দেশ দেন তিনি এবং তারিখ ধরে ইভিএম খোলার বিষয়টিও লক্ষ্য করতে বলেন। যদি দেখা যায় কোনও ইভিএম-এর ব্য়াটারির চার্জ রয়েছে ৭০ শতাংশ, তাহলে বুঝতে হবে ওই মেশিন নতুন। সেক্ষেত্রে দলের কাউন্টিং এজেন্টদের ভিভিপ্যাট গণনার দাবি তোলার কথা বলেন অভিষেক।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, সাম্প্রতিক দাবিতে ছড়াচ্ছে ইভিএম কারচুপি সংক্রান্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো মন্তব্য।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ তোলা হলেও, তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ইভিএম কারচুপির সেই অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইভিএম সংক্রান্ত মন্তব্যের ভাইরাল ভিডিওটি সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময়ের নয়। বরং সেটি ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর লোকসভার বাইরের ভিডিও।