

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গত বছরের ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর গ্রেফতার হয়েছিলেন বাংলাদেশি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। পরের দিন অর্থাৎ ওই বছরের ২৬ নভেম্বর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয় চট্টগ্রাম আদালত। আর এর পরেই আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ শুরু করেন তাঁর অনুগামীরা। বিক্ষোভ চলাকালীন সাইফুল ইসলাম আলিফ নামক এক আইনজীবীর মৃত্যু হয়।
তবে আদালত চত্বরে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সাইফুলকে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১ জুন সেই মামলাতেও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্রধান অভিযুক্ত করে মোট ৩৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দেয় বাংলাদেশ পুলিশ। আর এই দুই মামলায় আদালতের নির্দেশে জেল হেফাজতে রয়েছেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। এরই মধ্যে সম্প্রতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাংলাদেশে সরকার গঠন করেছে বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান।
আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ছবি-সহ দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের পর জামিন পেয়েছেন হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। উদাহরণস্বরূপ, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের একটি ছবি-সহ এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বাংলাদেশ থেকে ইউনুস বিদায় নিতেই জামিন পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু। #BreakingNews #Bangladesh” কমেন্ট সেকশনে অনেকেই বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এর জন্য ধন্যবাদও জানাচ্ছে।

আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের পর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং তিনি এখনও জেলেই রয়েছেন।
সত্য উন্মোচন
প্রথমত, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন পাওয়ার দাবিটি সন্দেহজনক। কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের পর আদালতের তরফে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করা হলে সেই সংক্রান্ত খবর অবশ্যই প্রথম শ্রেণির বাংলাদেশি এবং অন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অবশ্যই প্রকাশিত হবে। কিন্তু আমরা আমাদের অনুসন্ধানে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদন খুঁজে পাইনি যা থেকে এর সত্যতা প্রমাণ হয়।
তবে অনুসন্ধানে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪-এর ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই দিন চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। মামলার প্রধান অভিযুক্ত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ভার্চুয়ালি সেই মামলায় হাজির করা হয়। তবে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর আইনজীবী অপূর্ব ভট্টাচার্য শুনানি প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকলেও তিনি কোনও সওয়াল করেননি।

অপূর্ব ভট্টাচার্য বিডিনিউজ২৪-কে জানান "এই মামলার অভিযোগ থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর অব্যাহতি চেয়ে আমরা উচ্চ আদালতে আবেদন করেছি। আবেদনটি শুনানির জন্য গতকাল (মঙ্গলবার) থেকে হাই কোর্টের কার্য তালিকায় আছে। তাই আমরা আজ শুনানিতে সময় প্রার্থনা করেছি, জেরা করিনি। আদালত সময়ের আবেদন মঞ্জুর করেছেন।" অন্যদিকে চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ জাহিদুল হকের আদালত এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৯ মার্চ ধার্য করেছেন। তবে সেই প্রতিবেদনের কোথাও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন পাওয়া সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখানে উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর গ্রেফতার হওয়ার পর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে জামিন প্রদান করে বাংলাদেশ হাইকোর্ট। তবে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের নির্দেশ খারিজের দাবিতে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের কাছে আবেদন করে সরকার। পরবর্তীতে ওই বছরের ৬ মে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয় বাংলাদেশের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক।

পাশাপাশি, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমরা চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর আইনজীবী অপূর্ব ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু বর্তমানে জেল হেফাজতেই রয়েছেন। ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর জেল মুক্তি হয়নি। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৬টি মামলা চলছে। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি এগুলির মধ্যে ৫টি মামলার শুনানি হবে বাংলাদেশ হাইকোর্টে।”
এর থেকে প্রমাণ হয়, বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূস সরকারের পতনের পর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের পর জামিন পেয়েছেন হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস।
বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূস সরকারের পতনের পর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং বর্তমানে তিনি জেল হেফাজতেই রয়েছেন।