

সম্প্রতি এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকা। আর এই ঘটনার বিচারের দাবিতে যখন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম, ঠিক সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে বেশকিছু যুবককে বাইকে করে এক যুবতীকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে যুবতী সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে।
ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শাসিত বাংলায় প্রকাশ্য দিবালোকে ২০-২৫ জন উগ্রহিন্দু যুবক হাওড়া কলেজের এক মুসলিম যুবতী, আছমা খাতুনকে অপরণ করে নিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “প্রকাশ্য দিবালোকে ২০/২৫ জন হিন্দু যুবক মিলে পশ্চিম বঙ্গের হাওড়ার কলেজ পড়ুয়া আছমা খাতুন কে তুলে নিয়ে চলে গেল। শুভেন্দুর সরকারে এদের সাহস এতটাই বেড়ে গেছে যে, এখন আর আইনের কোনো ভয় নেই। এই নির্মম দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। প্রানের ভয়ে আশেপাশের মুসলিমরা কেউ এগিয়ে আসেনি।"

আজতক ফ্যাক্ট চেকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের নয় এবং এর সঙ্গে কোনও সাম্প্রদায়িকতার রং নেই। বরং সেটি ২০২৬ সালের ৭ জুলাই মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানি জেলার রাজপুর তহসিল এলাকার বাবার বাড়ি থেকে এক আদিবাসী হিন্দু যুবতীকে তার স্বামী হুকুম রাওয়াতের তরফে অপহরণের দৃশ্য।
সত্য উন্মোচন
ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৬ সালের ৮ জুলাই ভাইরাল ভিডিও এবং এর স্ক্রিনশট-সহ দৈনিক ভাস্কর-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভিডিওটি চলতি বছরের ৭ জুলাই মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানি জেলার রাজপুর তহসিলের ইন্দ্রপুর গ্রামের মাঠ থেকে প্রকাশ্য দিনের আলোতে এক যুবতীকে অপহরণের ঘটনা।

মূলত ‘বেজা’ নামে পরিচিত আদিবাসী প্রথা অনুসারে ওই যুবতীর পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার বাগদত্তা স্থানীয় নিহালি গ্রামের বাসিন্দা হুকুম রাওয়াতের থেকে ২ লক্ষ টাকা নেয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরেও যুবতীর পরিবারের তরফে তাকে হুকুম রাওয়াতের বাড়ি পাঠাতে অস্বীকার করা হয়। এরপরেই, গত ৭ জুলাই বিকালে হুকুম তার প্রায় ২৫-৩০ জন সহযোগীকে নিয়ে যুবতীকে তার বাবার বাড়ি সংলগ্ন গ্রামের মাঠ থেকে টেনেহিঁচড়ে একটি বাইকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। তবে স্থানীয় গ্রামবাসীদের দাবি অনুযায়ী, বাগদানের পর ওই যুবতী হুকুমের সঙ্গে তিনদিন একসঙ্গে ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারে হুকুম আগে থেকেই বিবাহিত। আর সেই কারণেই তিনি নিজের বাবার বাড়ি ফিরে আসেন।

তবে কোনও প্রতিবেদনেই নিগৃহীতা যুবতীর নাম বা তার ধর্মীয় পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। তাই এরপর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে আমরা আজতকের বারওয়ানি জেলা সংবাদদাতা জায়েদ আহমেদ শেখ, রাজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারীক মাধব সিং ঠাকুর এবং নিগৃহীতা যুবতীর ভাই মাখেল সিসোদিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা সকলেই আজতক ফ্যাক্ট চেককে নিশ্চিত করেন যে ভাইরাল ভিডিও-র কোনও সাম্প্রদায়িকতার রং নেই। নির্যাতিতা এবং তার অপহরণকারী হুকুম রাওয়াত দু’জনেই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
পাশাপাশি, নির্যাতিতার ভাই মাখেল জানান, “আমার বোনেপ নাম মনীষা সিসোদিয়া এবং আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। আমরা বোন পরিবারকে না জানিয়ে নিজের ইচ্ছায় ভালোবেসে হুকুম রাওয়াতে বিয়ে করে। কিন্তু সে যখন হুকুমের বাড়িতে যায় তখন জানতে পারে হুকুম আগে থেকেই বিবাহিত। তাই সে হুকমের সঙ্গে সংসার না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের কাছে চলে আসে। কিন্তু হুকুম তার অনুগামীদের নিয়ে আমার বোনকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছি। এবং পুলিশ আমার বোনকে উদ্ধার করে অভিযুক্তদের অনেককেই গ্রেফতার করেছে।”
এর থেকে প্রমাণ হয়, মিথ্যে সাম্প্রদায়িকতার রং লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে মধ্যপ্রদেশের অপহরণের ভিডিও।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রকাশ্য দিবালোকে ২০-২৫ জন উগ্রহিন্দু যুবক হাওড়া কলেজের এক মুসলিম যুবতী, আছমা খাতুনকে অপরণ করে নিয়ে গেছে।
ভাইরাল ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের নয় এবং এর সঙ্গে কোনও সাম্প্রদায়িকতার রং নেই। বরং সেটি ২০২৬ সালের ৭ জুলাই মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানি জেলার রাজপুর এলাকা থেকে এক আদিবাসী হিন্দু যুবতীকে তার স্বামী হুকুম রাওয়াতের তরফে অপহরণের দৃশ্য।