ফ্যাক্ট চেক: খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রার দৃশ্য দাবিতে ছড়াল অসম্পর্কিত ভিডিও

আজতক ফ্যাক্ট চেকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিও দুটির সঙ্গে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রার কোনও সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে তাঁর তথাকথিত মৃতদেহর ছবিটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।

Advertisement
ফ্যাক্ট চেক: খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রার দৃশ্য দাবিতে ছড়াল অসম্পর্কিত ভিডিও

ইজরায়েল ও মার্কিন যৌথ বাহিনীর হামলায় ২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে মৃত্যু হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের। যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তৈরি করেছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে আলি খামেনেইয়ের তথাকথিত অন্তিম যাত্রার দুটি ভিডিও এবং তাঁর মৃতদেহের একটি ছবি।

আজতক ফ্যাক্ট চেকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিও দুটির সঙ্গে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রার কোনও সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে তাঁর তথাকথিত মৃতদেহর ছবিটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা ভিডিও দুটি এবং ছবিটির সত্যতা যাচাই করব। 

খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রা নয়, ইরাকে ঈমাম মুসা আল-কাজিমর তাবুত যাত্রা:

প্রথম ভিডিওতে কোনও একটি স্থানে কালো পোশাক পরিহিত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় ঠেলে কয়েকজনকে সবুজ কাপড়ে ঢাকা একটি কফিন নিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে ভিড়ের মধ্যে থেকে বহু মানুষ সেই কফিন স্পর্শ করার চেষ্টা করছেন। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ইরানে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রা বা তাঁর মৃতদেহ সৎকারে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বিদায় হে বিশ্ব মুসলিম রাহাবার,খামেনি (রহ্) #khameni #alikhameni” 

তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রার নয়। কারণ ইজরায়েল ও মার্কিন যৌথ বাহিনীর হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয়েছে খামেনেইয়ের। কিন্তু এই একই ভিডিও তার বেশকিছুদিন আগে অর্থাৎ চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি দুটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে পাওয়া যায়। উভয় ভিডিও-র ক্যাপশনে ‘ঈমাম মুসা আল-কাজিম’ ‘ইরাক’ এবং ‘বাগদাদ’ লেখাগুলি পাওয়া যায়। 

সেই সূত্র ধরে পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই একই স্থানে একই রকম সবুজ কাপড়ে ঢাকা কফিন নিয়ে জনসমগমের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেই ভিডিও-র শিরোনাম অনুযায়ী সেটি, কাজমাইনে ঈমাম মুসা আল-কাজিম-র তাবুত যাত্রার দৃশ্য। এখানে উল্লেখ্য, ‘তাবুত’ হল একটি প্রতীকী কফিন যেটি শিয়া মুসলিমরা নিজেদের ধর্মগুরুদের স্মরণসভায় ব্যবহার করেন। এবং মুসা আল-কাজিম হলেন শিয়া মুসলিমদের সপ্তম ঈমাম। ৭৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর (মতান্তরে ৩১ আগস্ট) তাঁর মৃত্যুর পর ইরাকের বাগদাদের কাদিমিয়া শহরে অবস্থিত আল-কাজমাইন মাজারে তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল। আল-কাজমাইন মাজার নিয়ে অনুসন্ধান চালালে সেটির ছবির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওতে থাকা স্থান এবং মাজারের হুবহু মিল পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় ভিডিওটি ইরানে নয় বরং  ইরাকের আল-কাজমাইন মাজারে তোলা হয়েছিল।

Advertisement

খামেনেই নয়, ইরাকের শুওয়াইলাত গোত্রের প্রধান:

দ্বিতীয় ভিডিওতে শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কোনও একটি স্থানে গাড়ি থেকে একটি কফিন নামিয়ে একটি ঘরের মধ্য নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ব্যক্তি। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ইরানে গাড়ি থেকে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের কফিন নামানোর দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, আল্লাহ তুমি সবাই কে ধৈর্য্য ধরার তাওফিক দাও... #iran #Irannews #ইরান ” 

তবে আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ক্লিপটি গাড়ি থেকে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের কফিন নামানোর দৃশ্য নয়। বরং সেটি ইরাকের শুওয়াইলাত গোত্রের প্রধান শেখ আরকান হামিদ মুহান আল-খাইরাল্লাহর কফিন নামানোর দৃশ্য। যিনি চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মারা যান। ভাইরাল ভিডিওটি খামেনেইয়ের মৃত্যু আগে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ইরাক ভিত্তিক একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার করা হয়েছিল।

খামেনেইয়ের মৃতদেহ নয়, AI নির্মিত ছবি:

ভাইরাল ছবিটিতে কোনও একটি ভেঙে পড়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষের নিচে পড়ে আছেন দাড়ি ওয়ালা এক ব্যক্তি। অন্যদিকে, ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর চারজন কর্মী। ছবিটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ইজরায়েল ও মার্কিন যৌথ বাহিনীর হামলার পর আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের দেহ উদ্ধারের দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ছবিটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন 😭 মুসলিম বিশ্বের এক সাহসী কণ্ঠ, এক অবিচল নেতা, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আর আমাদের মাঝে নেই — এমন সংবাদ সত্যিই হৃদয় বিদারক।” 

তবে ভাইরাল ছবিটি নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় আমরা সেটিতে একাধিক অসঙ্গতি লক্ষ্য করি। প্রথম, ছবির ব্যক্তির মুখের সঙ্গে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মুখের কোনও মিল নেই। দ্বিতীয়ত, ছবির ব্যক্তির নাক, কপাল ও ঠোঁটের আকৃতিও সঠিক নয়। যা সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি ছবির ক্ষেত্রে দেখা যায়। যা থেকে সন্দেহ তৈরি হয় ছবিটি এআই নির্মিত হলেও হতে পারে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে একশো শতাংশ নিশ্চিত হতে এরপর আমরা ভাইরাল ছবিটিকে Hive Moderation নামক এআই যাচাইকারী ওয়েবসাইটে পরীক্ষা করি। ওয়েবসাইটি ৯৯.৮ শতাংশ নিশ্চিতভাবে জানিয়েছে যে ভাইরাল ছবিটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।

তবে এখানে উল্লেখ্য, আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্য বা অন্তিম যাত্রার কোনও ছবি বা ভিডিও ইরান সরকারের তরফে প্রকাশ করা হয়ে থাকলে সেগুলি দেশটির তথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অবশ্যই প্রকাশিত হবে। কিন্তু, প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত আমরা আমাদের অনুসন্ধানে এই সংক্রন্ত নির্ভরযোগ্য কোনও প্রতিবেদ বা তথ্য খুঁজে পাইনি। 

এর থেকে প্রমাণ হয়, আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের তথাকথিত অন্তিম যাত্রা ও তাঁর মৃতদেহ দাবিতে শেয়ার করা হচ্ছে অসম্পর্কিত ভিডিও এবং AI নির্মিত ছবি।

Advertisement

ফ্যাক্ট চেক

facebook users

দাবি

ভিডিওগুলিতে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্য বা অন্তিম যাত্রার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

ফলাফল

ভাইরাল ভিডিও দুটির সঙ্গে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অন্তিম যাত্রার কোনও সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে তাঁর তথাকথিত মৃতদেহর ছবিটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। 

ঝুট বোলে কাউয়া কাটে

যত বেশি কাক তত বেশি মিথ্যে

  • কাক: অর্ধসত্য
  • একাধিক কাক: বেশির ভাগ মিথ্যে
  • অনেক কাক: সম্পূর্ণ মিথ্যে
facebook users
আপনার কী মনে হচ্ছে কোনও ম্যাসেজ ভুয়ো ?
সত্যিটা জানতে আমাদেরসংখ্যা73 7000 7000উপর পাঠান.
আপনি আমাদেরfactcheck@intoday.com এ ই-মেইল করুন
POST A COMMENT
Advertisement