

ইজরায়েল ও মার্কিন সেনার যৌথ বাহিনীর হামলায় মৃত্যু হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের। এমনকি, এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সেনাপ্রধান আব্দুল রহিম মৌসাভি। এরপরেই ইজরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন সেনা ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান।
আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে ইজরায়েল, সৌদি আরব এবং দুবাইতে ইরানের হামলা সংক্রান্ত তথাকথিত তিনটি ভিডিও। কিন্তু আমরা আমাদের অনুসন্ধানে দেখেছি যে এই ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই। এই প্রতিবেদনে আমরা ভিডিওগুলির সত্যতা যাচাই করব।
দুবাইয়ের CIA-র সদর দফতর নয়, শারজাহর বহুতল ভবনে আগুন:
প্রথম ক্লিপটিতে কোনও একটি বহুতল আবাসনে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ইরানের তরফে দুবাইয়ে অবস্থিত CIA-এর সদর দফতরে বিমান হামলার দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ এই মাত্র দুবাইয়ে আমেরিকার CIA সদর দফতরে হামলা। দুবাইয়ে CIA দফতরে ইরানের মিসাইল হামলা।। জ্বলছে আ*গু*ন…” এমনকি রিপাবালিক বাংলা এবং জি নিউজ-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের তরফেও এই একই ভিডিও একই দাবি-সহ শেয়ার করা হয়েছে।

তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটি দুবাইয়ে অবস্থিত CIA-এর সদর দফতরে ইরানের বিমান হামলার দৃশ্য নয়। বরং সেটি ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহর আমিরাতি সিটিতে অবস্থিত একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য। সেই সময় ফক্স নিউজ এবং আরব নিউজ-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে তোলা অগ্নিদগ্ধ ভবনটির একাধিক ছবি ও ভিডিও-সহ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল।
সৌদি আরব নয়, তাইওয়ানের আসবাবপত্রের দোকানে অগ্নিকাণ্ড:
অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্লিপটিতে কোনও একটি শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত একটি বিল্ডিংয়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন দমকল কর্মীরা। দ্বিতীয় ক্লিপটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইরান। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বিমান হামলা চালিয়েছে ইরান।” পাশাপাশি, ভিডিও-র ফ্রেমের উপরে লেখা হয়েছে, “সৌদি আরব।”

প্রথমত দ্বিতীয় ক্লিপটি সন্দেহজনক। কারণ ভিডিওতে থাকা একাধিক দোকানের সামনে লাগোনো ব্যানার বা সাইন বোর্ডে চাইনিজ জাতীয় কোনও ভাষায় লেখা রয়েছে। যা থেকে সন্দেহ হয় যে ভিডিওটি সৌদি আরব বা মধ্য প্রাচ্যের কোন দেশের না হয়ে চিন বা তার পাশ্ববর্তী কোনও দেশের হতেও পারে। তাই বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আজতক ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভিডিওটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে সেগুলিকে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন দেখা যায় ভাইরাল ভিডিও ক্লিপটি সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে ইরানের বিমান হামলার নয়। বরং সেটি ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি তাইওয়ানের তাইচুং শহরের একটি আসবাবপত্রের দোকানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।

ইজরায়েল নয়, মেক্সিকো:
সবশেষে তৃতীয় ক্লিপটিতে কোনও একটি ব্যস্ত রাস্তা পাশে থাকা একটি বিল্ডিংয়ে ব্যপকভাবে আগুন জ্বলতে ও ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ইজরায়েলের মাটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ ইরানের মিসাইল হামলায় জ্বলছে ইস*রায়েল পালাচ্ছে জনগণ।”

তৃতীয় ক্লিপটি নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময়ও আমপা লক্ষ্য করি সেটির সঙ্গেও ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকার সঙ্গে চলমান সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই। বরে ক্লিপটি ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মেক্সিকোর সিনালোয়া প্রদেশের সিনেপোলিস প্লাজার রয়্যাল ইয়াক ক্যাসিনো এবং এয়ার জাম্প ট্রাম্পোলাইনস পার্কে ওয়েল্ডিং কাজ চলাকালীন আগুন লাগার দৃশ্য। সেই সময় মিরর ইউকে এবং ডেইলি স্টার-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও এবং সেটির একাধিক স্ক্রিন-সহ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল।

এর থেকে প্রমাণ হয় যে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাত দাবিতে ছড়াচ্ছে অসম্পর্কিত সব অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও।

ভিডিওগুলিতে দেখা যাচ্ছে ইজরায়েল, সৌদি আরব ও দুবাইয়ে অবস্থিত CIA-র সদর দফতরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইরান।
ভাইরাল ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং সেগুলি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ক্লিপ।