

যৌথভাবে আমেরিকা-ইজরায়েল সঙ্গে ইরানের সংঘর্ষের জেরে এই মুহূর্তে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ সংক্রান্ত তথাকথিত তিনটি ভিডিও। প্রতিটি ভিডিওই শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের হামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন ইজরায়েলের নাগরিকরা।
কিন্তু আমরা আমাদের অনুসন্ধানে দেখেছি যে এই ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই। এই প্রতিবেদনে আমরা ভিডিওগুলির সত্যতা যাচাই করব।
সাইপ্রাস নয়, আমেরিকা-মেক্সিকো বর্ডার:
প্রথম ভিডিওতে কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে এক মহিলাকে কাঁটাতারের বেড়া বা বর্ডার পার হতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, কাঁটাতারের সেই বেড়া পেরতে উভয় পাশ থেকে ওই মহিলাকে সাহয্য করছেন দু’জন পুলিশ এবং অন্য দু’জন মহিলা। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের হামলার ভয়ে কোলে দুধের শিশুকে নিয়ে দেশ ছেড়ে সাইপ্রাসে পালাচ্ছেন একজন ইজরায়েলি মহিলা। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “দেশ ছাড়ছে.... #ইহুদী #ইসরাইল #সাইপ্রাস।”

তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজ ন্যাশনের সাংবাদিক জর্জ ভেনচুরার অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের কোনও সম্পর্ক নেই।
ভিডিও-র ক্যাপশনে জর্জ ভেনচুরার তরফে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সেটি ২০২৩ সালের ২৭ মেক্সিকো-আমেরিকা বর্ডারের হুয়ারেজ সীমান্তের ঘটনা। ওইদিন ভেনেজুয়েলার একটি পরিবারের তরফে কোলে ছোট শিশুকে নিয়ে অবৈধভাবে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে আমেরিকার টেক্সাসের এল পাসোতে প্রবেশ করে। ওই ভিডিও-র কমেন্ট সেকশনে ওই পরিবারের অন্য একটি ভিডিও শেয়ার করে জর্জ ভেনচুরা উল্লেখ করেন, টেক্সাস ন্যাশনাল গার্ডের তরফে ওই পরিবারকে ফিরে যেতে বলা হলে তারা কাঁটাতারের বেড়ার নীচ দিয়ে ফিরে যায় এবং আমেরিকায় প্রবেশের জন্য অন্য এলাকায় চলে যায়। পাশাপাশি, ভাইরাল ভিডিও-র একটি স্ক্রিনশট-সহ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের তরফেও সেটিকে মেক্সিকো-আমেরিকা বর্ডারের দৃশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
Texas National Guard told migrants to go back and they right went back under the concerta wire and headed to another area to the enter the U.S. pic.twitter.com/EkxmC1t9SO
— Jorge Ventura Media (@VenturaReport) September 27, 2023
নেপালের পুরনো ভিডিও:
অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্লিপটিতে বহুসংখ্যক মানুষকে কোনও একটি দুর্গম পাহাড় চড়তে বা পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন লক্ষ লক্ষ ইজরায়েলি নাগরিক। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ব্রেকিং নিউজ........... #ইরানি মিসাইলের ভয়ে প্রমিস ল্যান্ড ছেড়ে পালাচ্ছে লাখ লাখ ইসরাইলি জনগণ।….”

তবে আজতক ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ২ জুন মেড-ইন-নেপাল নামক একটি নেপাল ভিত্তিক ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের ক্যাপশনে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সেটি নেপালের ডোল্পা জেলার রূপ-পাতন নামক একটি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানীয়দের তরফে ‘ইয়ারসাগুম্বা’ নামক একটি দামি ঔষধি ছত্রাক সংগ্রহের দৃশ্য। এখানে উল্লেখ্য, এর আগেও এই একই ভিডিও ইরান ছেড়ে সেদেশের নাগরিকদের পালানোর দৃশ্য দাবিতে শেয়ার করা হয়েছিল। সেই সময় ইন্ডিয়া টুডের তরফে ভিডিওটির বিস্তারিত ফ্যাক্ট চেক করা হয়। সেই ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদনটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

ফ্রান্সের সঙ্গীত উৎসব:
তৃতীয় ভিডিতে কোনও একটি স্থানে বহুসংখ্যক মানুষকে কাঁধে লাগেজ এবং হাতে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিওটিও শেয়ার করে একই দাবি করা হচ্ছে যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন লক্ষ লক্ষ ইজরায়েলি নাগরিক। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “মি/সা/ইলের ভয়ে হিজরাইলিরা পালাচ্ছে।”

তবে আমাদের ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ১৯ জুন একটি টিকটক হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিও-র ফ্রেমের উপরে ফ্রেন্স বা ফরাসি ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে, “গতকাল হেলফেস্ট ক্যাম্পসাইট খোলা হয়েছে।” উক্ত তথ্যের উপরে ভিত্তি করে এই সংক্রন্ত অনুসন্ধান চালালে জানা যায়, ‘হেলফেস্ট’ হলো বিশ্বের অন্যতম বড় মেটাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল, যা প্রতিবছর ফ্রান্সের ক্লিসনে আয়োজিত হয়। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৯ জুন থেকে ২২ জুন পর্যন্ত ক্লিসনে এই মিউজিক ফেস্টিভ্যালটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে এবছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৯ জুন থেকে ২২ জুন এই মিউজিক ফেস্টিভ্যালটি আবারও অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর ফ্রান্সের ক্লিসনের হেলফেস্ট ক্যাম্পসাইট নিয়ে অনুসন্ধান চালালে গুগুল ম্যাপে ক্যাম্পসাইটের একাধিক ছবি পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে তোলা এমনই একটি ছবির দৃশ্যের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিও-র একাধিক ফ্রেমের হুবহু মিল পাওয়া যায়। যা নিশ্চিত করে ভিডিওটি ফ্রান্সের ক্লিসনের হেলফেস্টের।

পাশাপাশি এখানে উল্লেখ্য, সম্প্রতি একাধিক ইজরায়েলি এবং পার্সিয়ান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বহুসংখ্যক ইজরায়েলি জনগণ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, এবং অনেকেই দেশ ছেড়েও চলে গেছেন। তবে ভাইরাল ভিডিওগুলির সঙ্গে সেই ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে ইজরায়েলের উপরে ইরানের হামলার দৃশ্য দাবি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হচ্ছে অসম্পর্কিত সব ভিডিও।

ভিডিওগুলিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের হামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন ইজরায়েলের নাগরিকরা।
ভাইরাল ভিডিওগুলি ইরানের হামলার ভয়ে ইজরায়েলি নাগরিকদের দেশ ছেড়ে পালানোর দৃশ্য নয়। পাশাপাশি, সেগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই।