
অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে অশান্তির আগুন জ্বলছে এখনও। জেলায়-জেলায় মৃত্যু, অগ্নিসংযোগ, রাহাজানির মতো ঘটনা ঘটে চলেছে। হামলা চলেছে সরকারি সম্পত্তি, শেখ মুজিবের মূর্তি, নানা ভাস্কর্যের উপরও। এমন আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও রীতিমতো ভাইরাল। যেখানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি মূর্তি ভেঙে ফেলে হচ্ছে।
তবে এ মূর্তি আর পাঁচটা সাধারণ মূর্তির মতো নয়। এই মূর্তির মুখ টেপ দিয়ে আঁটা। এবং হাতে গীতাঞ্জলি রক্তাক্ত ও পেরেকবিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশে চলমান অশান্তির সময়ে অনেকেই ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে বলার চেষ্টা করছেন তা এখনকার সময়ের।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভিডিওটি পোস্ট করে লিখেছেন, "ও দেশের জাতীয় সঙ্গীত তোমারই দেওয়া। আজ তোমার স্থান এইভাবে মাটিতে। পাপ কোনোদিন বাপকে ছাড়বে না।"
কেউ কেউ আবার একই ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, "বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তিও নিস্তার পেল না।"
বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তেওয়ারি ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, "কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে বাংলাদেশের কাছ থেকে এর থেকে বেশি কিছু আশা করার ছিল কি? লজ্জা ... এরা নাকি আবার নিজেদের বাঙালি বলে দাবি করে।"
কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে বাংলাদেশের কাছ থেকে এর থেকে বেশি কিছু আশা করার ছিল কি?
— Tarunjyoti Tewari (@tjt4002) August 7, 2024
লজ্জা ... এরা নাকি আবার নিজেদের বাঙালি বলে দাবি করে। pic.twitter.com/OABn05oEau
সেই সঙ্গে আরও একটি ছবিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি ভেঙে তার আবক্ষটি খালি পড়ে রয়েছে। সেটা শেয়ার করে লেখা হয়েছে, "রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করো নি..." হায় বাঙালি হায়...! এ লজ্জা কি করে ঢাকব...! ছি: !!! এই বারের ২২শে শ্রাবণে বাঙালির সেরা প্রাপ্তি... বিশেষ কিছু বলার নেই, এটা দেখার পর বলার ভাষা থাকাও উচিৎ নয়...! তিনি আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক...!"
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে, এই ভিডিও ও ছবি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি প্রায় দেড় বছর আগেকার।
কীভাবে জানা গেল সত্যি
ভাইরাল ভিডিওটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে তার রিভার্স ইমেজ সার্চ করতেই আমরা আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদন দেখতে পাই। সেখানে ছবিতে রবীন্দ্রনাথের মুখে টেপ লাগানো হুবহু একই ছবি দেখতে পাওয়া যায়। খবরটি প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।
ওই খবরে লেখা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ভাস্কর্যের মাথা উধাও হয়ে গিয়েছিল যা খানিকটা দূরে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের এক কোণে, জঞ্জালের মধ্যে উদ্ধার হয়। সেই খবর অনুযায়ী, গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস বিভাগের পড়ুয়ারা সে দেশে চলতে থাকা নিপীড়ন, দমন এবং কণ্ঠরোধের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথের মুখে টেপ লাগিয়ে ও গীতাঞ্জলিতে পেরেক পুঁতে বিক্ষোভ জানাতে এই প্রতীকী ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে এই ভাস্কর্যটি রাখার পরিকল্পনা থাকলেও আচমকা তা উধাও হয়ে যায়।
যেহেতু ভাইরাল ভিডিওটি বাংলাদের প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যম প্রথম আলোর লোগো স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল, তাই আমরা সেই অনুযায়ী কিছু কিওয়ার্ড সার্চ করি এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিও-র আসল সংস্করণটি প্রথম আলোর ইউটিউব চ্যানেলে পাই ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আপলোড করা হয়েছিল।
‘গুম হয়ে গেছেন’ রবীন্দ্রনাথ-শিরোনামে আপলোড হওয়া ভিডিওতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিমুল কুম্ভকার জানান যে বাঁশ ও কাগজ দিয়ে এই ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছিল। এবং হঠাৎ-ই তারা দেখতে পান যে সেটি সেখানে নেই। কেউ বা কারা তা সরিয়ে নিয়েছে। এরপরই যেখানে ভাস্কর্যটি রাখা হয়েছিল, সেখানে গুম হয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ লিখে একটি পোস্টার লাগানো হয়।
সেই সময়, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই ভাঙা ভাস্কর্যের ছবি ব্যবহার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো হয়েছিল যে মৌলবাদী চরমপন্থীরা এই মূর্তি ভেঙেছে। তবে তখন ইন্ডিয়া টুডের পক্ষ থেকে শিমুল কুম্ভকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিন অর্থাৎ প্রশাসনিক বিভাগ সেই সময় ওই ভাস্কর্যটি সরিয়ে দিয়েছিল। যদিও পরে এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক এবং জলঘোলা হলে ভাঙা ভাস্কর্যটি পুরনায় সেখানে স্থাপন করা হয়। এই নিয়ে ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন এখানে পড়া যাবে।
ভাস্কর্যটি যে পুনরায় স্থাপিত হয়েছিল সেই ভিডিওটিও আমরা প্রথম আলোর আরেকটি প্রতিবেদনে দেখতে পাই।
অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্যের ভাঙা মুখের ছবিটিও ওই একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ২০২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বিডি নিউজ ২৪-এ ওই একই ছবি দেখা যায়। সঙ্গে লেখা হয়- "গুম হওয়া’ রবীন্দ্র-ভাস্কর্য মিলল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।"
অর্থাৎ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে একটি পুরনো এবং অসম্পর্কিত ঘটনার ভিডিও এবং ছবিকে ২২শে শ্রাবণের ঘটনা, অর্থাৎ সাম্প্রতিক ঘটনা বলে দাবি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ion-
২২শে শ্রাবণ, অর্থাৎ ৬ অগস্ট বাংলাদেশের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি ভেঙে ফেলা হল।
এই ছবি বা ভিডিওগুলি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। বরং ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়ন ও বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ ফাইন আর্টস বিভাগের পড়ুয়ারা এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে দেখিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা সরিয়ে দেয়।