

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির সামনে মহিলারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, এই দাবিতে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের গরুর মাংস খেতে দিতে হবে, এই দাবিতে নাকি হিন্দুদের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ-আন্দোলন করা হচ্ছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে জনাকয়েক মহিলা ও মহিলা হাতে কাটারি, লাঠি নিয়ে এক জায়গায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পুলিশকর্মীরাও। ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “CM এর বাড়ির সামনে প্রতিবাদ করছে।”

এই ভিডিওটি পোস্ট করে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির সামনে মহিলারা হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রতিবাদ করছে, বিক্ষোভ জানাচ্ছে। এই প্রথমবার দেখলাম, মুসলিমদের হয়ে হিন্দুরা মাঠে নেমেছে। তার কারণ, যে মুসলিমরা যাতে গরু খায়, তাদের গরু খাওয়া যাতে বন্ধ না হয়, এই নিয়ে হিন্দুরাই আন্দোলন করছে। ব্যপারটা হচ্ছে যে এরা মুসলিমদের টাইট করতে গিয়ে নিজেরাই টাইট হয়ে গেছে।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির সামনের নয়। সেই সঙ্গে এই ভিডিওটির সঙ্গে গরুর মাংসে বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। ভিডিওটি অন্য ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সত্য় উদ্ঘাটন
ভাইরাল ভিডিওটি রিভার্স সার্চ ইমেজের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ক্লিপ সিপিআইএম নেতা ময়ূখ বিশ্বাসের এক্স হ্যান্ডেলে পাওয়া যায়। গত ১২ মে এই ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে তিনি লেখেন, “বাঁশিহারিতে সিধু-কানহুর মূর্তি ভেঙেছে বিজেপি-আরএসএস। রাস্তায় নেমেছেন আদিবাসী মহিলারা। ক্ষোভকে শক্তিতে পরিণত করুন। বিজেপি-আরএসএস মনুবাদী হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিয়ে বহুত্ববাদ ধ্বংস করতে চায়। বাংলার সংস্কৃতিকে রক্ষা করুন। মনুবাদী হিন্দুত্বকে প্রতিহত করুন। একসঙ্গে লড়াই করুন। বাঁশিহারি থেকে শিক্ষা নিন। হুল জোহর!”

প্রসঙ্গত, বাঁশিহারি হলো দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি এলাকা। এই সূত্র ধরে সার্চ করা হলে দেখা যায়, তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একই দাবিতে মূর্তি ভাঙার দাবিতে পৃথক একটি ভিডিও শেয়ার করেছিলেন।
এই প্রসঙ্গে আরও সার্চ করা হলে দ্য টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে সবরং নামের একটি ওয়েবসাইটেরও রিপোর্ট পাওয়া যায়। উভয় রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সাঁওতাল বিদ্রোহের দুই কিংবদন্তি সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর মূর্তি ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ দিনাজপুরের বাঁশিহারির দেউরিয়া গ্রামে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। ৯ মে রাতে বা ভোরে দুষ্কৃতীরা সিধু-কানহুর মূর্তির হাত ভেঙে দেয় এবং ঘটনাস্থলে বিজেপির পতাকা রেখে যায়। সকালে স্থানীয় মানুষ বিষয়টি দেখতে পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু মানুষ বিজেপির সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
এরপর শতাধিক গ্রামবাসী, যাদের মধ্যে বহু আদিবাসী মহিলা ছিলেন, বিক্ষোভে সামিল হন। অনেককে তির-ধনুক, লাঠি ও ঝাঁটা হাতে দেখা যায়। তাঁরা বাঁশের ব্যারিকেড ফেলে বুনিয়াদপুর-দৌলতপুর রাস্তা অবরোধ করেন। সকাল প্রায় ৭টা থেকে শুরু হওয়া অবরোধে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তেজিত জনতা কয়েকটি দোকান ও একটি বিজেপি পার্টি অফিসে ভাঙচুর চালায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিজেপির পতাকা, চেয়ার ও টেবিলে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাঁশিহারি থানার বিশাল পুলিশবাহিনী, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কমব্যাট ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
উত্তরবাংলা সংবাদ ও রায়গঞ্জ কুলিক নিউজ নামের আবার দুটি ফেসবুক পেজে ১৩ মে প্রকাশ পাওয়া দুটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে তোলা হলে আদালত অভিযুক্তদের তিনদিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠায়।
ফলে সবমিলিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না যে একটি পৃথক ঘটনার ভিডিওকে সম্পূর্ণ অন্য দাবিতে শেয়ার করা হয়েছে যা পুরোপুরি ভিত্তিহীন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির সামনে মহিলারা হাতে অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। মুসলিমদের গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ না করার দাবিতে হিন্দুরা আন্দোলনে নেমেছেন।
ভাইরাল ভিডিওটি শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির সামনের নয়। এটি দক্ষিণ দিনাজপুরের বাঁশিহারির একটি বিক্ষোভের ভিডিও, যেখানে সিধু-কানহুর মূর্তি ভাঙচুরের প্রতিবাদে আদিবাসী মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন।