

ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে চলতে থাকা সংঘর্ষের রেশ এসে পৌঁছেছে ভারতের দোরগোড়ায়। ভারতের আমন্ত্রণে আসা একটি ইরানি রণতরীকে ধ্বংস করে বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আমেরিকা। অন্যদিকে, আজারবাইজানের মতো দেশেই ইরানের করা ড্রোন হামলার খবর মিলেছে।
এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে যে, সেখানে ইজরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে হামলা চালাতে দেখা গেছে ইরানের মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রকে। এই প্রতিবেদনে এমনই তিনটি ভিডিও-র সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে, যেগুলির সঙ্গে বর্তমানে চলমান ইরান-ইজরায়েল কোনও সম্পর্ক নেই।
কোনও বাড়ির বারান্দা থেকে রেকর্ড করা এই ভিডিও-র অদূরেই দেখা যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে পরপর বিস্ফোরণ হতে। সঙ্গে মিসাইলের মতো বস্তু উড়ে আঘাত হানতে ও বিরাট আকারে আগুন জ্বলতেও দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে একে ইরানের ‘ফাত্তাহ-২’ হাইপারসনিক মিসাইলের আঘাত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “পশ্চিমা করপোরেট মিডিয়া এই সত্যগুলো ধামাচাপা দিচ্ছে; অথচ ইসরায়েলের ওপর ইরানের ‘ফাত্তাহ-২’ হাইপারসনিক মিসাইলের নিরবচ্ছিন্ন আঘাত অব্যাহত রয়েছে। তেল আবিবের আকাশে এখন কেবলই ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ। ইরানের এই হাইপারসনিক গতি ১০টিরও বেশি ইন্টারসেপ্টরকে অনায়াসেই ফাঁকি দিচ্ছে, যার ফলে ইসরায়েলের তথাকথিত অপরাজেয় এয়ার ডিফেন্স আজ সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত।”
আজতক ফ্য়াক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি ইজরায়েল বা তেল আবিবের নয়। এটি ভেনিজুয়েলার রাজধানী ক্যারাকাসের দৃশ্য। ঘটনাটি গত জানুয়ারি মাসের।
ভাইরাল ভিডিওটিকে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ভিডিও সিজিটিএন আফ্রিকার ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যায় যা গত ৩ জানুয়ারি পোস্ট করা হয়েছিল। ক্যাপশনে লেখা হয় যে ভেনিজুয়েলার ক্যারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে।
এই বিষয়ে কিওয়ার্ড সার্চ করা হলে জানা যায় যে, আমেরিকা যে সময় ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক আটক করে আমেরিকায় নিয়ে আসে, সে সময়ই এই বিস্ফোরণগুলি ঘটে। যদি কী কারণে এই বিস্ফোরণ হয়েছিল সেই বিষয়ে সবিস্তারে কিছু জানানো হয়নি।
এই ক্লিপে দূর থেকে ধারণ করা একটি ভিডিওতে এক বিরাট আকারের বিস্ফোরণ হতে দেখা যাচ্ছে মরুভূমির মতো একটি স্থানে। বিস্ফোরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও রেকর্ড করা ব্যক্তি ছাদ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ভেতরে আশ্রয় নিচ্ছেন, এমন দৃশ্য উঠে এসেছে।

ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “ইসরায়েলের তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।”
তবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে ভিডিওটি আসল নয়, বরং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তৈরি।
প্রথমত, তেল আবিব একটি রাজধানী শহর, কোনও মরুভূমি এলাকা নয়। ফলে, ভিডিওতে থাকা প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকেই দাবির সত্যতা নিয়ে সংশয় জাগে। সেই সঙ্গে, ক্যামেরা হাতে থাকা ব্যক্তিকে বিস্ফোরণের পর ছাদের একটি দরজা দিয়ে দু-তিনটে সিঁড়ি নিচে নামতে দেখা যায়। কিন্তু নিচে নামার পর ক্যামেরা উপরের দিকে ঘোরানো হলে সেখানে কোনও দরজা দেখা যায় না। পাশাপাশি, নামার সময় ক্যামেরাধারী ব্যক্তি দু-তিনটে সিঁড়ি নামলেও নিচে নেমে ক্যামেরা ঘোরানো হলে দেখা যায় সিঁড়ির সংখ্যা বেড়ে ১০-১২ হয়ে গেছে। যা থেকে অনুমান করা যায় যে ভিডিওটি এআই নির্মিত হতে পারে।

এআই যাচাইকারী টুলের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলে সেখানেও নিশ্চিত করা হয় যে ভিডিওটি ৯২ শতাংশ এআই দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।
এই ভিডিওতে দূর থেকে বহুতলে ঘেরা একটি শহরে পরপর ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়তে এবং বিস্ফোরণ হতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “তেল আবিববাসীর ভায়াবহ ভোর: ইরানের ব্যালিস্টিক ঝড়ে আয়রন ডোমের পরাজয়, বহু ক্ষয়ক্ষতি।”

তবে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে একই ভিডিও ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। খবর অনুযায়ী, সেই সময় ইজরায়েলের হামলার জবাবে পাল্টা তেল আবিবে একাধিক মিসাইল হামলা চালিয়েছিল ইরান। ভিডিওটি সেই সময়ের।

অর্থাৎ সবমিলিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না যে পুরনো, অসম্পর্কিত ও এআই দ্বারা তৈরি ভিডিও-র মাধ্যমে ইরান দ্বারা ইজরায়েলের হামলার দাবি করা হচ্ছে যা বিভ্রান্তিকর।

ভিডিওগুলিতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে ইরান সম্প্রতি ইজরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ভাইরাল ভিডিওগুলির মধ্যে কিছু পুরনো ও সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের ঘটনার, একটি এআই দ্বারা তৈরি এবং অন্যটি আগের সংঘর্ষের সময়কার—বর্তমান ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষের সঙ্গে এগুলির কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই।