

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গিয়েছিল রাজ্যে। বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সরকারি কর্মীদের জন্য বর্ধিত ডিএ এবং সপ্তম পে কমিশন। এই ধরনের ১০০টির বেশি নানা প্রতিশ্রুতি নানা সময়ে শোনা গিয়েছিল বিজেপি নেতাদের মুখে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখনও পর্যন্ত কোন কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার পথে অগ্রসর হলো সরকার? বাকিও বা রইল কী কী? এখনই না উঠলেও অদূর ভবিষ্যতে প্রশ্ন আসবেই। কিন্তু এতো প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসেব রাখবে কে?
সেই মুশকিল আসানের দিশা দেখাতে এ বার সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি ওয়েবসাইট। যাকে পোশাকি ভাষায় বলা হচ্ছে — প্রতিশ্রুতি পূরণের রিয়েল টাইম ট্র্যাকার। অর্থাৎ, কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কী কী পূরণ হলো, কতগুলো প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ চলছে, কোন প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কতটা বাকি রয়েছে, এবং কত শতাংশ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে, সব তথ্য এক ক্লিকেই দেখা যাবে। সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য সরকারের কাছে কতটা সময় অবশিষ্ট রয়েছে, সেই কাউন্টডাউনও দেখা যাবে।

এই ওয়েবসাইটের লিঙ্ক অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে শেয়ার করে দাবি করেছেন, বিজেপি সরকার এই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে। রিয়েল টাইম প্রমিস ট্র্যাকারে বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকার দেখাবে যে কতটা প্রতিশ্রুতি পূরণ হলো।
কেবলমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাই নয়, সংবাদ প্রতিদিন, কলকাতা টিভি-সহ একাধিক সংবাদ মাধ্যমে এই ওয়েবসাইটকে বিজেপি সরকারের উদ্যোগ বলে তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের খবরের শিরোনামে লেখা হয়েছে — “নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কতটা পূরণ হল? রিয়েল টাইম ট্র্যাকার দেখাবে বিজেপি সরকার, চালু পোর্টাল”।

তবে আজতক ফ্যাক্ট চেক টিম এই নিয়ে অনুসন্ধান করে দেখতে পায়, এই ওয়েবসাইটটি রাজ্যের বিজেপি সরকার, বা বিজেপির দলীয় উদ্যোগে তৈরি করা হয়নি। বরং, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের কাজ কতটা মেলে, সেই হিসেব স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে এক এক্স (সাবেক টুইটার) ব্যবহারকারী নিজের উদ্যোগে এই ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন।
ওয়েবসাইটের খুঁটিনাটি
প্রথমেই বলা রাখা দরকার, সব ওয়েবসাইটেরই একটি ডোমেইন এক্সটেনশন থাকে যা ওয়েবসাইট অ্যাড্রেসের শেষের অংশে দেখা যায়। যেমন gov.in (Government & India) ডোমেইন ভারতের সরকারি ওয়েবসাইট নির্দেশ করে। কিছু কিছু সরকারি ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে nic.in ডোমেইনও ব্যবহার করা হয়। আবার শুধুমাত্র .in (India) কোনও বেসরকারি ভারতীয় ওয়েবসাইট নির্দেশ করে। আবার ওয়েবসাইটের অ্যাড্রেসের শেষে .org (Organization) থাকলে তা বেসরকারি অলাভজনক সংস্থার নির্দেশক। যেমন বঙ্গ বিজেপির দলীয় ওয়েবসাইটে (bjpbengal.org) রয়েছে।
কিন্তু এই রিয়েল টাইম ট্র্যাকার ওয়েবসাইটের (bjp-govt-wb.pages.dev/) শেষে .dev ডোমেইন এক্সটেনশন ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ওয়েবসাইটের নামের শেষে .dev ডোমেইন এক্সটেনশন (যেমন: mysite.dev) থাকার মানে হলো, সেটি মূলত ওয়েব ডেভেলপার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার বা প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য তৈরি একটি বিশেষ ওয়েবসাইট। এই ডোমেইন এক্সটেনশনটি গুগলের পরিচালনায় চলে। যে কারণে এই ডোমেইনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রযুক্তি দুনিয়ায় ব্যক্তিগত অ্যাপ বা ওয়েবসাইট তৈরির সময় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের জন্য ডেভেলপাররা এই এক্সটেনশনটি ব্যবহার করেন।
এর থেকে একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই ওয়েবসাইটি কোনও সরকার বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা আধিকারিকভাবে পরিচালিত নয়, বরং কোনও ব্যক্তি দ্বারা স্বাধীনভাবে পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট।
সেই সঙ্গে whois.domaintools.com-এর মতো ওয়েবসাইট পরীক্ষা করার টুলের সাহায্যে সার্চ করা হলে দেখা যায়, সাধারণত সকল সরকারি ওয়েবসাইট — যেমন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মূল ওয়েবসাইট এবং আয়ুষ্মান ভারত এগুলি ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের অন্তর্গত National Informatics Centre (NIC)-এর অধীনস্থ নেম সার্ভার ব্যবহার করে।

কিন্তু bjp-govt-wb.pages.dev — এই ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে cloudflare.com-এর নেম সার্ভার ব্যবহার করা হয়েছে। উক্ত বিষয়গুলি যাচাই করলে মোটামুটি একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই ওয়েবসাইটের সঙ্গে বর্তমান রাজ্য সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই।
সেই সঙ্গে যদি দলগতভাবে বিজেপির পক্ষ থেকে এই ওয়েবসাইট চালু করা হয়ে থাকতো, তবে বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে কোথাও না কোথাও এর উল্লেখ পাওয়া যেত। কিন্তু বিজেপির এক্স হ্যান্ডেল, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত কোনও বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি। যার ফলে পরিষ্কার হয় যে দলীয়ভাবে বিজেপির পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নেপথ্যে কে বা কারা?
ওয়েবসাইটের বিষয়ে বিশদে সার্চ করা হলে দেখা যায়, প্রথমবার এই ওয়েবসাইটি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছিলেন Mr. Bhawjo নামের এক ব্যবহারকারী। গত ১২ মে এই ওয়েবসাইটের লিঙ্ক পোস্ট করে তিনি লেখেন, প্রিয় @BJP Bengal (পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি), আপনারা যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার সবকিছুরই একটি তালিকা এখানে রয়েছে। আমরা নজর রাখব, আপনারা সত্যিই সেগুলো পালন করেন কি না।
Dear @BJP4Bengal, here is the checklist of everything you promised. We’ll keep checking whether you actually do it.https://t.co/EMkgFqUOHY@BJP4India @narendramodi pic.twitter.com/tOnWsCO2Zn
— Mr. Bhawjo ࿗ (@BhojoGourango) May 12, 2026
ওই এক্স পোস্টের রিপ্লাইয়ের অংশটি খতিয়ে জনৈক Mr. Bhawjo-র বেশ কিছু উত্তর পাওয়া যায়, যা থেকে সাফ হয়ে যায় যে ওয়েবসাইটি তিনি ও তাঁর দু-একজন সঙ্গী মিলে তৈরি করেছেন। একটি অংশে তিনি অন্যান্য় রাজ্যের মানুষদের এগিয়ে এসে ClaudeAI এই সাহায্যে একই ধরনের ওয়েবসাইট তৈরি করার জন্য উৎসাহিত করেছেন, যাতে যে কোনও সরকারের জবাবদিহিতা এবং কাজের অগ্রগতি স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা যায়।

যখন অপর এক ব্যবহারকারী তাঁকে অনুরোধ করেন যাতে সকলেই এই ওয়েবসাইটে নিজেদের তথ্য যোগ করতে পারেন, তখন তিনি জবাবে বলেন যে এই ওয়েবসাইটের সোর্স কোড (ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে সোর্স কোড হলো এর মূল ভিত্তি বা অদৃশ্য কঙ্কাল। এটি এমন একদল নির্দেশনাবলী যা কোনও প্রোগ্রামার কম্পিউটারের পাঠযোগ্য ভাষায়, যেমন- HTML, CSS, JavaScript লিখে থাকেন, যা পরবর্তীতে ওয়েব ব্রাউজারকে নির্দেশ দেয় ওয়েবসাইটটি কীভাবে কাজ করবে এবং স্ক্রিনে কী দেখা যাবে) খোলা রয়েছে এবং যে কেউ এতে নিজের থেকে তথ্য যোগ বা আপডেট করতে পারেন। সেই সঙ্গে যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় যে ওয়েবসাইটটি কে বানিয়েছে তিনি উত্তরে জানান যে এটি তাঁর এক বন্ধুর বানানো এবং ওয়েবসাইটে থাকা সোর্স কোড কপি করে যে কেউ নিজের রাজ্যের তথ্য এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তৈরি করে নিতে পারেন।
এর দেখাদেখি অপর এক এক্স ব্যবহারকারী কর্নাটক রাজ্যে কংগ্রেস সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং অগ্রগতি নিয়ে একই ধরনের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেলেন যা নিচে দেখা যাবে।

সেই সঙ্গে আলোচিত ওয়েবসাইটের নিচের অংশে পরিষ্কারভাবে লেখা হয় যে, “এটি কোনও রাজনৈতিক ওয়েবসাইট নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের পরিচালিত একটি পাবলিক নোটপ্যাড — যাতে আমাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আমরা ভুলে না যাই। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা মতামত নয়, তথ্যকে অনুসরণ করি।”

এই ওয়েবসাইট সম্পর্কে আরও বিশদ তথ্য পেতে আমরা Mr. Bhawjo-র এক্স হ্যান্ডেলে একটি মেসেজও করি। কিন্তু এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত তাঁর থেকে কোনও উত্তর আসেনি। Mr. Bhawjo-র উত্তর এলে এই প্রতিবেদনটি আপডেট করে দেওয়া হবে।
সবমিলিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে প্রতিশ্রুতি পূরণের রিয়েল টাইম ট্র্যাকার হিসেবে ভাইরাল হওয়া ওয়েবসাইটি বিজেপি সরকারে বা দলের নয়, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে যাতে সাধারণ জনগণ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের হিসেব নিজেদের হাতের মুঠোয় রাখতে পারেন।