

আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে ফের একবার সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম হয়ে উঠেছে সিঙ্গুর ও টাটা নিয়ে। একধারে যেমন সব সংবাদ মাধ্যম নজর রেখেছে সিঙ্গুরের দিকে। অপরদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হচ্ছে টাটা গোষ্ঠীর বর্তমান চেয়ারম্যানের একটি তথাকথিত উক্তি।
ভাইরাল হওয়া এই পোস্টে টাটা গোষ্ঠীর বর্তমান চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরনের একটি কথিত উক্তি ইংরেজি ও বাংলায় তুলে ধরা হয়েছে। পোস্টে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের তারিখ দিয়ে বাংলায় লেখা হয়েছে, “পশ্চিমবঙ্গে যদি বামপন্থীদের সরকার আসে, তবেই আমরা আবার বঙ্গে শিল্প করতে পারবো। শ্রদ্ধেয় রতন টাটা ও বুদ্ধ বাবুর স্বপ্নের সিঙ্গুর প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু বামপন্থীদের সরকার না এলে তা কখনই সম্ভব নয়।”

ইংরেজিতে যে উক্তি ভাইরাল হয়েছে তার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “শুধুমাত্র একটি বামপন্থী প্রশাসনের ছত্রছায়াতেই পশ্চিমবঙ্গের শিল্প নবজাগরণ সত্যিকার অর্থে বিকশিত হবে। আমরা সিঙ্গুর প্রকল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে অবিচলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা ছিল প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রতন টাটার শিল্প উত্তরাধিকারের এক দূরদর্শী মিলনস্থল।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল পোস্টে থাকা উভয় উক্তি ভুয়ো, ভিত্তিহীন এবং মনগড়া। টাটা গোষ্ঠীর বর্তমান চেয়ারম্যান এই ধরনের কোনও মন্তব্য করেননি।
সত্য় উদ্ঘাটন
যদি টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান পদমর্যাদার কোনও ব্যক্তি এহেন রাজনৈতিক মন্তব্য করে থাকতেন, তবে সেই নিয়ে কোনও না কোনও ধরনের প্রতিবেদন যে কোনও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেত। কিন্তু এই ধরনের খবর কোনও সংবাদ মাধ্যমেই পাওয়া যায়নি।
এরপর টাটা গোষ্ঠীর বর্তমান চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরন ও পশ্চিমবঙ্গের বিষয়ে কিওয়ার্ড সার্চ করা হলে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত একাধিক সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট পাওয়া যায়। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য হিন্দুর মতো একাধিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে দীর্ঘ ১৪ বছরে প্রথমবার টাটা গ্রুপের কোনও প্রধান কর্তা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন।
তবে এই বৈঠকের পর টাটা গ্রুপের পক্ষ থেকে বা চন্দ্রশেখরনের তরফ থেকে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বৈঠক নিয়ে একটি টুইট করেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, “তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে তাঁরা বাংলায় আরও বেশি করে বিনিয়োগ করতে চান এবং তিনি খুব শীঘ্রই বাংলায় এসে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।” তবে তারপর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই বৈঠক পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
ভাইরাল ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ধরনের ছবি টাটা গ্রুপের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে পাওয়া যায়। এখানে নটরাজনের একই ছবি এবং একই ধরনের ডিজাইনের গ্রাফিক কার্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে সেই গ্রাফিক কার্ডে অন্য বার্তা ছিল। এই পোস্টের ক্যাপশনে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যানকে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বারা নাইটহুড উপাধি দেওয়ার কারণে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে, পোস্টে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান এই সম্মান পেয়ে একটি বার্তা দিয়েছিলেন।
Congratulations to our Chairman N. Chandrasekaran on receiving an honorary knighthood by His Majesty, King Charles for services to UK-India business relations. Here is a message from our Chairman on this award. pic.twitter.com/zoe8FJW00B
— Tata Group (@TataCompanies) February 14, 2025
সেই বার্তায় নটরাজন বলেন, এই সম্মানে তিনি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এবং ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতি ধন্যবাদ জানান। তিনি টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের দৃঢ় ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। তিনি গোষ্ঠীর অধীনস্থ বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলির কথা উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাজ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স, ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষাগত সহযোগিতার কথাও বলেন। তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভবিষ্যতে সেখানে টাটা গোষ্ঠীর উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার আশা প্রকাশ করেন।
অর্থাৎ, সবমিলিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না যে একটি ভুয়ো এবং ভিত্তিহীন উক্তিকে টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের আসল উক্তি বলে প্রচার করা হচ্ছে যা পুরোপুরি ভিত্তিহীন।

টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরন বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকার এলে তবেই শিল্পে বিনিয়োগ সম্ভব এবং সিঙ্গুর প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা যাবে।
এই দাবি সম্পূর্ণ ভুয়ো ও ভিত্তিহীন। উক্তিও মনগড়া। টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরন এ ধরনের কোনও রাজনৈতিক মন্তব্য করেননি।