বাঁকড়া মসজিদ বিতর্ক - AI দ্বারা নির্মিত ছবিবিতর্কের নাম বাঁকড়া মসজিদ। কলকাতা বিমানবন্দরের একেবারে রানওয়ের মধ্যেই অবস্থিত একটি মসজিদ। এই মসজিদকে অক্ষত রেখেই তৈরি হয়েছিল বিমানবন্দরের রানওয়ে। সেই মসজিদের নমাজ পাঠ আপাতত বন্ধ। গত শনিবার থেকে বিমানবন্দরের মধ্যে দিয়ে ওই মসজিদে ঢোকার এন্ট্রি পাসও বন্ধ করা হয়েছে।
কেন বাঁকড়া মসজিদের নমাজ পাঠ বন্ধ?
কলকাতা বা দমদম বিমানবন্দরের মধ্যে ওই প্রাচীন মসজিদের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। মসজিদটিকে সরানোর চেষ্টা আজ নতুন নয়। বহু বছর ধরেই চলছে। মূলত রানওয়ের মধ্যে মসজিদটি এয়ারপোর্ট অথরিটির জায়গায় অবস্থিত। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মসজিদটির জন্য একধারে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। কারণ, কারা এই বিমানবন্দরের ভেতরে নমাজ পড়তে ঢুকছেন, তাঁদের জন্য কোনও বৈধ পাস ইস্যু হয় না। শুধুমাত্র আধার কার্ডের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে পৌঁছে তাঁরা নমাজ পড়েন। এছাড়া মসজিদটি রানওয়ে সংলগ্ন হওয়ায় সেকেন্ডারি রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। সেকেন্ডারি রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে রয়েছে এই মসজিদ। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি স্পষ্ট বলছে, রানওয়ে থেকে যে কোনও কাঠামোর ন্যূনতম দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। মূলত, রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য মসজিদটিকে সরানোর তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার।
যশোর রোডে বিরাটি ছাড়িয়ে আরও উত্তরে গেলে বাঁকড়া
বস্তুত, বাঁকড়া মসজিদ সরানোর প্ল্যান নতুন নয়। যশোর রোডে বিরাটি ছাড়িয়ে আরও উত্তরে গেলে বাঁকড়া। বাঁকড়া মোড়ের উল্টো দিকে বিমানবন্দরের সাত নম্বর গেটের ভিতরে ওই মসজিদ। যাঁরা নিয়মিত সেখানে যান, তাঁরা মূলত স্থানীয় বাসিন্দা। অতীতেও একাধিক বার রানওয়ে সম্প্রসারণ নিরাপত্তার ইস্যুতে মসজিদকে সরিয়ে অন্যত্র প্রতিষ্ঠার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবে হয়নি। বাম আমলে এই মসজিদ নিয়ে কোনও রকম পদক্ষেপ করার আলোচনা ওঠেনি। বর্ষীয়ান বাম নেতা রবীন দেবের কথায়, 'আমাদের আমলে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কখনও রাজনীতি হয়নি। আর বাঁকড়া মসজিদ সরানোর বিষয়েও কোনও পদক্ষেপ করার কথা আমার জানা নেই।' তৃণমূলের আমলে ২০২০ সালে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য এই মসজিদ সরানোর জন্য আলোচনা শুরু হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাজ্য সরকারের অসহযোগিতায় তা সম্ভব হয়নি।
#WATCH | Kolkata, West Bengal: On Bankra mosque at Kolkata airport, TMC leader Madan Mitra says, "...This is a highly sensitive religious issue; I do not wish to discuss it further. I would earnestly appeal to all religious groups and the government to deliberate carefully,… pic.twitter.com/PEIwmVPtBY
— ANI (@ANI) July 13, 2026
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, 'জাতীয় সুরক্ষা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আগে দেখতে হবে। এই বিমানবন্দরের লোকেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। চিন, বাংলাদেশ সব কাছে। এটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখানে এভাবে খুলে রাখা যায় না। আমরা তো কাউকে ধর্মপালনে বাধা দিইনি। ভদ্র থাকবেন। আইন মেনে চলবেন। কোনও অসুবিধা নেই। সব ঠিক চলবে। সুন্দর চলবে।'
বাঁকড়া মসজিদের ইতিহাস
অনেকের কাছে এই মসজিদের নাম গৌরীপুর জামা মসজিদ। ইতিহাস বলছে, ১৯২৪ সালে ব্রিটিশরা দমদমে এয়ারপোর্ট তৈরি করে। তারও ৩৪ বছর আগে ওই এলাকায় তৈরি করা হয়েছিল মসজিদ। অর্থাত্ ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ মানুষের নিজস্ব অর্থায়নে এটি তৈরি হয়। একসময় বাংলাদেশের সাতক্ষীরা এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এসে এই ঐতিহাসিক মসজিদে নমাজ পাঠ করতেন। বর্তমানেও উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বহু মানুষ এখানে নমাজ পড়েন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে এবং পরে তা ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের (AAI) হাতে তুলে দেয়। সেই সময় শতবর্ষপ্রাচীন এই গ্রাম্য মসজিদটি সংরক্ষণ করা হবে, এমন একটি মৌখিক বা প্রশাসনিক সমঝোতা ছিল বলে মনে করা হয়।
এর আগে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে বিমান চলাচল বাড়তে থাকায় বিমানবন্দর পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয় এবং একটি নতুন (সেকেন্ডারি) রানওয়ে তৈরি করা হয়। সেই সময় মূল রানওয়ের উত্তর ও পশ্চিম দিকের একাধিক গ্রাম উচ্ছেদ করে বাসিন্দাদের যশোর রোডের ওপারে, বর্তমান মধ্যমগ্রাম এলাকায় পুনর্বাসিত করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর থেকে বহুবার মসজিদটি ভেঙে ফেলার নয়, বরং অন্য একটি উপযুক্ত জায়গায় স্থানান্তরের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই নানা প্রশাসনিক, আইনি ও ধর্মীয় জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ থমকে যায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য কোনও স্থায়ী সমাধান বের করা সম্ভব হয়নি।
#WATCH | Kolkata: On Bankra mosque at Kolkata airport, Siddiqullah Chowdhury, former minister and president of West Bengal State Jamiat Ulama-i-Hind, says, "It dates back to 1890—long before independence. It is our misfortune that the Ministry of Aviation or the Airport Authority… pic.twitter.com/LSMb9diEWS
— ANI (@ANI) July 13, 2026
কী বলছেন বিরোধী নেতারা?
জমিয়ত উলেমায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর কথায়, 'বিষয়টি দুঃখজনক, কিন্তু এ নিয়ে কেউ রাস্তায় নামবেন না। আমরা বিজেপির সঙ্গে ঝগড়া চাই না। আমরা চাই যেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ মসজিদে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে। জোর করে মসজিদের দরজা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক কাজ হয়নি।' অন্যদিকে মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মদন মিত্রের কথায়, 'এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ধর্মীয় বিষয়। তাই এ নিয়ে আমি আর কোনও মন্তব্য করতে চাই না। আমার আন্তরিক আবেদন, সরকার এবং সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা যেন আলোচনার মাধ্যমে, সকলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি সমাধানে পৌঁছন, যাতে সব পক্ষই সন্তুষ্ট থাকে এবং কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে। অর্থাৎ, এমন সমাধান হোক যাতে 'সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে'।