বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য তৃণমূলের অদিতি মুন্সী এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর হয়ে মামলা লড়েছেন CPIM-এর বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। তারপর থেকেই বামেদের অন্দরে 'আদর্শ' বনাম 'পেশাদারিত্ব'-এর দ্বন্দ্ব চলছে। ফেসবুকে একাংশ তুমুল সমালোচনা শুরু করেছেন বাম নেতার। সেই তালিকায় যেমন রয়েছেন নিচুতলার কর্মীরা, তেমনই রয়েছেন শ্রীলেখা মিত্র, সৌরভ পালোধীর মতো পরিচিত বামপন্থী শিল্পীরাও। নেটিজেদের অপর একটি অংশ আবার আইনজীবী বিকাশের 'প্রফেশনালিজম'-এর ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে বেজায় অস্বস্তিতে CPIM.
কেন বিকাশকে নিয়ে বিতর্ক?
রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অদিতি মুন্সীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছেন বর্তমান বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। অদিতির নির্বাচনী হলফনামায় দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি তরুণজ্যোতির। তিনি তাঁর বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির হিসেবে লুকিয়েছেন বলে অভিযোগ। বিশেষত জমি বিক্রির কোনও তথ্যই উল্লেখ করেননি হলফনামায়। তরুণজ্যোতির করা এই মামলার প্রেক্ষিতে গ্রেফতারির আশঙ্কা করছেন অদিতি ও তাঁর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তী। তাঁদের হয়েই মামলাটি লড়েছেন বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।
এরপর থেকেই তীব্র সমালোচনার ঝড় তাঁকে নিয়ে। কীভাবে একজন বাম নেতা, তৃণমূলের তোলাবাজিতে অভিযুক্তের হয়ে কোর্টে সওয়াল করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও নিজের এই কাজের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন আইনজীবী বিকাশ।
বিকাশের যুক্তি
bangla.aajtak.in-কে বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, 'তাঁর বিরুদ্ধে তো কোনও রাজনৈতিক অভিযোগ ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আয়ের অসঙ্গতি নিয়ে। তিনি বেআইনিভাবে টাকা রোজগার করেছেন কি না, সেটা নিয়ে অভিযোগ। যাঁরা বলছেন তাঁরা না জেনে, না বুঝে বলছেন। আর কিছু BJP-র লোক তাঁদের তাতাচ্ছেন। যারা এর মধ্যে রাজনীতি দেখছেন, তাঁরা BJP-র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বলছেন। রাজনৈতিক কারণ না থাকলে তো মামলায় না লড়ার কোনও কারণ নেই। হার্ট অ্য়াটাক হলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে কি বলতে হয় কোন রাজনীতি করেন?'
তাহলে কি মমতা-অভিষেক এলেও তাঁদের হয়ে মামলা লড়বেন? বিকাশ যুক্তি দিয়েছেন, 'অভিষেক-মমতা সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা BJP-র নেতৃত্বে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে দুর্নীতি করেছে। আর এঁরা তো চুনোপুটি।' তিনি মুকুল রায়, সব্যসাচী দত্তের মতো ব্যক্তিদের হয়ে অতীতে মামলা লড়ার প্রসঙ্গও টেনেছেন। জানিয়েছেন, তিনি পেশাগত আদর্শ হল, যে আসবেন, তাদের সঙ্গে যদি দর্শনগত ভাবে বিরোধ না হয়, তাহলে মামলা লড়বেন।
বিকাশের সমালোচনা বামেদের
নাট্যকার তথা CPIM সমর্থক সৌরভ পালোধী ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, 'যে পার্টির চুরি আর দুর্নীতির জন্য আপনারা পার্টির হাজার হাজার কর্মী খুন হল, তাদের চুরি যে চুরি নয়, এটা প্রমাণ করতে আপনি কোর্টে লড়বেন? এটা আপনি আপনার কাজ বলে ন্যারেটিভ সেট করবেন? এ কেমন কমরেডশিপ? আপনি আপনার শত্রু শিবিরের হয়ে কোর্টে সওয়াল করবেন? আপনার শুধু কাজ আছে। সুদীপ্ত, মইদুলের কোনও কাজ ছিল না।'
শ্রীলেখা মিত্র, দীর্ঘ একটি পোস্ট করে লিখেছেন, 'কাউকে দেখে কমিউনিস্ট রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ঠ হইনি। ব্যক্তির থেকে আদর্শ সর্বদা উপরে রেখেছি।' সবশেষে লিখেছেন, 'বিকাশবাবুকে গাল পাড়ার আগে একটু অপেক্ষা করে দেখুন কী হয়।'
আবার সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, বাম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশের অনুজ তাঁরই সমর্থন করে একটি পোস্ট করেছিলেন ফেসবুকে। যদিও সেই পোস্ট বর্তমানে ডিলিটেড।
এদিকে, বাম নেতা শতরূপ ঘোষ একটি দলীয় সমর্থকের পোস্ট শেয়ার করেছেন। যেখানে জনৈক দেবাশিস নন্দী জানাচ্ছেন, তাঁর রিকশাচালক বাবা কোনওদিন নিজের আদর্শের সঙ্গে আপোস করেননি। ২০০ টাকার বিনিময়ে তাঁকে কংগ্রেস ভোটের দিন রিকশা চালানোর জন্য বুকিং করলেও তিনি আদর্শকেই বেছে নিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তির কথায়, 'প্রফেশনাল এথিক্সকে বলে বলে গোল দিয়েছে বাবার চেতনা।'
এদিকে, তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী, যিনি প্রায়শই নিজেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অগ্রণী যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরেন, সেই তিনি এখন দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে বিদ্ধ এক প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক এবং তাঁর স্বামীর পক্ষে আদালতে সওয়াল করছেন। এই বৈপরীত্য বিস্ময়কর।'
উল্লেখ্য, এখনও পর্যন্ত পার্টির পক্ষ থেকে এই ইস্যুতে কোনও অফিশিয়াল পোস্ট না নেই। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সুজন চক্রবর্তীর তোলাবাজদের নিয়ে করা একটি পোস্ট যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।