মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শীতের বঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ এখন তুঙ্গে। বৃহস্পতিবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির (I-PAC) অফিস এবং সংস্থার প্রধান প্রতীক জৈনের বাড়িতে অভিযান চালায়। এই অভিযানের খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগত ভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ED আধিকারিকদের মুখোমুখি হন। তল্লাশির মাঝেই হার্ক ডিস্ক, ফাইল এবং মোবাইল ফোন নিয়ে বেরিয়ে আসেন। ED-র বিরুদ্ধে FIR পর্যন্ত দায়ের করেছেন।
অভিযোগ, I-PAC অভিযান আদলতে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল উন্মোচনের একটি প্রচেষ্টা। ED-র বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদক্ষেপ বিরোধী দলগুলিকে আক্রমণের সুযোগ করে দিয়ছে। BJP এটিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার দাবি জানিয়েছে।
এই ঘটনাটি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তৃণমূল কংগ্রেস এবং BJP-র মধ্যে রাজনৈতিক লড়াইকে আরও চরমে পৌঁছে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, BJP-র দাবিই কি শেষ পর্যন্ত সত্যি হবে? বাংলা কি তবে রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকেই এগিয়ে যাবে? ৩৫৬ ধারা বলবৎ করার জন্য কি এটাই উপযুক্ত সময়?
ED অভিযান এবং মমতার হস্তক্ষেপ
ED অভিযানটি একটি মূলত একটি পুরনো মামলার জেরেই হয়েছে। কয়লা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত লেনদেনের টাকার সঙ্গে I-PAC জড়িত বলে অভিযোগ তুলেছে ED। I-PAC এর সহ প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রধান নির্বাচনী কৌশলবিদ। ED-র দাবি, তল্লাশির সময়ে জব্দ করা নথি এবং ইলেকট্রনিক তথ্যপ্রমাণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে 'দুষ্টু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী' বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ED তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ তথ্য, প্রার্থীতালিকা এবং নির্বাচনী কৌশল চুরির চেষ্টা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তল্লাশির মাঝেই প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে একটি হার্ড ডিস্ক এবং একটি সবুজ ফাইল বের করে আনেন।
তবে কেন্দ্রীয় এজেন্সির সঙ্গে মমতার সংঘাত প্রথম নয়। ২০১৯ সালে CBI অভিযানের সময়ে অবস্থান বিক্ষোভ করেছিলেন রাজীব কুমারের সমর্থনে। তবে এবার ঠিক ভোটের মুখে এই ঘটনা ঘটনায়, বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে কার হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কারণে গ্রেফতারি থেকে কোনও সাংবিধানিক সুরক্ষা নেই তাঁর। যদি ED প্রমাণ করে, ফাইলগুলি তদন্তের স্বার্থে সম্পর্কিত তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারেন।
রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি
CPIM রাজ্য সম্পাদর মহম্মদ সেলিম বলেব,'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীক জৈনকে রক্ষা করছেন কারণ তাঁর কাছে দুর্নীতির সমস্ত নথি রয়েছে।' কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, I-PAC তৃণমূলের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছে। উভয় দলই মমতার অবিলম্বে গ্রেফতারির দাবি জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি জোরদার করছে BJP।
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ৩৫৬ ধারার পক্ষে জোরাল সওয়াল করেছেন।
রাষ্ট্রপতি শাসনের কি সম্ভাবনা রয়েছে?
৩৫৬ ধারা অনুসারে, কেন্দ্র রাজ্যপালের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে। কিন্তু এসআর বোমাই মামলায় (১৯৯৪) সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত এটিতকে সীমিত করে দিয়েছে। বলা হয়েছে, রাজ্যের সাংবিধানিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়লেই কেবল রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা যেতে পারে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে।
বর্তমানে মমতার হস্তক্ষেপ তদন্তে বাধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা আইনের চোখে অপরাধ। যদি ED প্রমাণ করে, মমতা তথ্যপ্রমাণ মুছে ফেলেছেন, তাহলে তাঁকে গ্রেফতার করা সম্ভব।
সংবিধানের ৩৫৬ ধারা অনুসারে, যদি কোনও রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া নির্দেশ মেনে চলতে ব্যর্থ হয় তাহলে রাষ্ট্রপতি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন, রাজ্যের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। এটি ৩৫৬ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি শাসন আরোপের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।
শুভেন্দু বলেন, ৫ মের মধ্যে সরকার তৈরি না হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে। নির্বাচন কমিশনের সেই ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে বাংলায় তৃণমূল শক্তিশালী জায়গায় রয়েছে। সেক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতারিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যা রাষ্ট্রপতি শাসনের জন্য উপযুক্ত হতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এটি কঠিন।