Kolkata Climate Risk : হু হু করে বাড়বে তাপমাত্রা; জমা জলে জীবন হবে জেরবার; বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শহর কলকাতা

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অতিরিক্ত গরম। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গরমের প্রভাব শুধু দিনের তাপমাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে না। শহরের বাড়িঘর, কংক্রিটের রাস্তা, অ্যাসফল্ট এবং কমে যাওয়া খোলা জায়গার কারণে রাতে তাপ বেরোতে সময় লাগে।

Advertisement
হু হু করে বাড়বে তাপমাত্রা; জমা জলে জীবন হবে জেরবার; বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শহর কলকাতাবিপদের সামনে কলকাতা
হাইলাইটস
  • দ্বিতীয় বড় সমস্যা অতিবৃষ্টি এবং জল জমা
  • কলকাতায় অল্প সময়ে খুব বেশি বৃষ্টি হলে শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হয়

বিশ্বের বড় শহরগুলির মধ্যে বাড়ছে জলবায়ুগত ঝুঁকি। আর সেই তালিকায় রয়েছে কলকাতাও। নতুন সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, আগামী দিনে আরও গরম এবং জলমগ্ন পরিস্থিতির সাক্ষী থাকতে পারে তিলোত্তমা। ক্রমাগত অস্বস্তিকর আবহাওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, বিশ্বের বড় শহরগুলির মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী এখন ষষ্ঠ স্থানে। শুধু কলকাতা নয়, তালিকায় রয়েছে আমেদাবাদও। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা শহরগুলির মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে গুজরাতের এই শহর। বেঙ্গালুরু রয়েছে ১২ নম্বরে এবং চেন্নাই ১৫ নম্বরে।

নতুন এই বিশ্লেষণ করেছে ক্লাইমেট ইনটেলিজেন্স সংস্থা AlphaGeo। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্বের ৭২টি বড় শহরকে নিয়ে সমীক্ষা করা হয়েছে। দেখা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোন শহরগুলি কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় শহরগুলির প্রস্তুতি কতটা। 

কলকাতার ঝুঁকি কতটা?

এই সমীক্ষায় ব্যবহার করা হয়েছে ক্লাইমেট রিস্ক এবং রিজিলিয়েন্স ইনডেক্স। এখানে শুধু কোনও শহরে কতটা গরম পড়ে বা কতটা বৃষ্টি হয়, তা দেখা হয়নি। বরং গরম, বন্যা, খরা এবং দাবানলের মতো প্রাকৃতিক বিপদের পাশাপাশি শহরগুলির পরিস্থিতি সামলানোর প্রস্তুতিও হিসাব করা হয়েছে।

কলকাতার স্কোর ৩৫। এই স্কোর অনুযায়ী বিশ্বের বড় শহরগুলির মধ্যে কলকাতা ষষ্ঠ সর্বোচ্চ জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তালিকার একেবারে উপরে রয়েছে আমদাবাদ এবং পাকিস্তানের হায়দরাবাদ। দু’টি শহরেরই RAJ স্কোর ৪১। পাকিস্তানের মুলতান রয়েছে ৩৮ স্কোর নিয়ে। বাংলাদেশের ঢাকা ৩৬ এবং পাকিস্তানের লাহোর ৩৫ স্কোর পেয়েছে।

অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ছয়টি শহরের সবকটিই দক্ষিণ এশিয়ায়। এই তালিকায় আমদাবাদ এবং কলকাতা থাকায় পাকিস্তানের পাশাপাশি একমাত্র ভারতই একাধিক শহর নিয়ে এই তালিকায় রয়েছে।

কী কী বিপদ আসতে পারে কলকাতায়?

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অতিরিক্ত গরম। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গরমের প্রভাব শুধু দিনের তাপমাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে না। শহরের বাড়িঘর, কংক্রিটের রাস্তা, অ্যাসফল্ট এবং কমে যাওয়া খোলা জায়গার কারণে রাতে তাপ বেরোতে সময় লাগে। ফলে অন্ধকার নামার পরও তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে।

Advertisement

এর সঙ্গে যদি আর্দ্রতা বেশি থাকে, তাহলে শরীরের উপর গরমের চাপ আরও বাড়ে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কলকাতায় শুধু ‘গরম দিন’ নয়, গরম রাতও বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

আর দ্বিতীয় বড় সমস্যা অতিবৃষ্টি এবং জল জমা। কলকাতায় অল্প সময়ে খুব বেশি বৃষ্টি হলে শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হয়। জল দ্রুত বেরোতে না পারলে রাস্তা, নিচু এলাকা এবং বাড়িঘরে জল ঢোকার আশঙ্কা বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির ধরন বদলে গেলে এই ধরনের হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি বা আরও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

গরম আর বৃষ্টি একসঙ্গে আরও বড় বিপদ

কলকাতার সমস্যা শুধু গরম বা শুধু বৃষ্টি নয়। অনেক সময় দু’টি সমস্যাই পরপর বা একই মৌসুমে দেখা দিতে পারে। প্রবল গরমে শহরের বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। বাড়ে AC, কুলার ও পাখার ব্যবহার। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে প্রবল বৃষ্টিতে রাস্তা জলমগ্ন হলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। অফিস, স্কুল, ব্যবসা- সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু আবহাওয়ার সমস্যা নয়। এটি শহরের অর্থনীতি, পরিবহণ, স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু জল নয়, জলসঙ্কটও সমস্যা

শুনতে অবাক লাগলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জলসঙ্কটের সম্পর্ক রয়েছে। একদিকে অতিবৃষ্টির সময় অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি কম হলে জল সরবরাহ এবং ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ বাড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতের কলকাতার জলবায়ু সমস্যা শুধু বন্যা নয়। একদিকে অতিরিক্ত জল, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় জলের ঘাটতি- দু’টি বিপরীত পরিস্থিতিই সামলাতে হতে পারে শহরকে।

ভারতের পরিস্থিতিও চিন্তার

কলকাতার ঝুঁকির এই রিপোর্ট এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত নিজেই ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর বা IMD-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ছিল ১৯০১ সালে দেশজুড়ে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর ভারতের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।

২০২৪ সালে দেশের গড় ভূমি-পৃষ্ঠের বায়ুর তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের তুলনায় ০.৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন কোনও দূরের ভবিষ্যতের বিষয় নয়। তার প্রভাব ইতিমধ্যেই ভারতের শহরগুলিতে দেখা যাচ্ছে।

শহর বড় হলেই ঝুঁকি বাড়ে

ভারতের শহরগুলি দ্রুত বাড়ছে। নতুন বাড়ি, রাস্তা, অফিস, কারখানা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়নের সঙ্গে খোলা জায়গা, জলাধার এবং প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থা কমে গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাঙ্কের ২০২৫ সালের একটি মূল্যায়নেও ভারতের ২৪টি শহর নিয়ে একই ধরনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। শহর যত বাড়ছে, ততই চরম গরম এবং বন্যার ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে নগরাঞ্চল। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।


তবে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, শহরগুলির হাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর সুযোগ রয়েছে। গরম মোকাবিলায় হিট অ্যাকশন প্ল্যান, জল জমা কমাতে উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা, জলাধার ও সবুজ এলাকা রক্ষা, বৃষ্টির জল ধরে রাখা এবং শহরের পরিকাঠামোকে আরও জলবায়ু-সহনশীল করে তোলা- এসব পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে পারে। সমস্যা হল, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি যত দ্রুত বাড়ছে, সেই তুলনায় শহরের পরিকাঠামো কত দ্রুত বদলানো যাচ্ছে।

কলকাতার ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্নটা শুধু 'কতটা গরম পড়বে?' নয়। প্রশ্ন হল, অতিরিক্ত গরমের সময় মানুষকে কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে, প্রবল বৃষ্টির জল কত দ্রুত বের করা যাবে এবং জলবায়ুর ধাক্কা সামলানোর জন্য শহর কতটা প্রস্তুত থাকবে।

সামনে সময় কম

Advertisement

AlphaGeo-র রিপোর্ট আসলে একটা সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা থেকে কোনও বড় শহরই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আমেদাবাদ, কলকাতা, ঢাকা, মুলতান, লাহোর- দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক শহর একই সমস্যার মুখোমুখি। তার কারণও অনেকটাই এক- অতিরিক্ত গরম, দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা। কলকাতার ক্ষেত্রে তাই আগামী দিনের লড়াই শুধু গরমের সঙ্গে নয়। একসঙ্গে সামলাতে হতে পারে তীব্র তাপপ্রবাহ, গরম রাত, অল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টি, জল জমা, বন্যা এবং জলসঙ্কট।
 

POST A COMMENT
Advertisement