
কানাডার রাস্তায় রামধনু রঙকলকাতার রামধনু রঙের রাস্তায় একের পর এক বাইক স্কিড করার ঘটনা ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। বৃষ্টির মধ্যে সদ্য রং করা রাস্তায় বাইকের চাকা পিছলে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চিংড়িহাটা ফ্লাইওভারের ঘটনা সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে, বিদেশেও কি এমন রঙিন রাস্তা রয়েছে? থাকলে সেখানে কি কখনও কলকাতার মতো বাইক দুর্ঘটনা ঘটেছে?
এই বিতর্কে কার্যত বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কথায়, ‘রং করার জন্য দুর্ঘটনা হয় নাকি! কতগুলো উড়ালপুলে দুর্ঘটনা হয়েছে?’ বিশ্বের একাধিক দেশে রামধনু রঙের রাস্তা রয়েছে বলে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। আসলেই আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে বহু বছর ধরেই তৈরি করা হয়েছে এমন রাস্তা। সেখানেও কি তবে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে?
বিদেশের রাস্তাগুলির অধিকাংশই পথচারীদের জন্য তৈরি রামধনু রঙের জেব্রা ক্রসিং। কলকাতার মতো যানবাহন চলাচলের মূল রাস্তা বা উড়ালপুলের দীর্ঘ অংশজুড়ে এমন রং করার উদাহরণ নেই।

ওয়েস্ট হলিউড, আমেরিকা
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েস্ট হলিউডে ২০১২ সালে তৈরি হয়েছিল স্থায়ী রামধনু রঙের ক্রসিং। San Vicente Boulevard এবং Santa Monica Boulevard-এর সংযোগস্থলে তৈরি এই ক্রসিংটি বিশ্বের প্রথম স্থায়ী Rainbow Crossing হিসেবে পরিচিত। সেখানে পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৪ সালে Los Angeles Times-এর একটি প্রতিবেদনে ওয়েস্ট হলিউডের ক্রসিংগুলিতে পথচারী ও গাড়ির সংঘর্ষের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছিল। তবে ওই দুর্ঘটনাগুলি রামধনু রং করা রাস্তার জন্য ঘটেছিল, এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও রয়েছে রামধনু রঙের রাস্তা। ২০১৩ সালে Taylor Square-এ তৈরি হয়েছিল অস্থায়ী Rainbow Crossing। তবে এই রং নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। রাস্তার রং বৃষ্টির সময় পিচ্ছিল হয়ে উঠতে পারে বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন নিউ সাউথ ওয়েলসের তৎকালীন পরিবহণমন্ত্রী। কিন্তু স্বাধীন নিরাপত্তা পরীক্ষায় ওই রঙিন ক্রসিংয়ের কারণে দুর্ঘটনা বা আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সিডনি সিটি কাউন্সিলের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও রয়েছে রামধনু রঙের রাস্তা। ২০১৩ সালে Davie Street এবং Bute Street-এর সংযোগস্থলে তৈরি হয়েছিল দেশের প্রথম স্থায়ী Rainbow Crossing। এই ক্রসিংয়ের মাধ্যমে পথচারীদের জন্য রামধনুর সাত রং ব্যবহার করা হয়। তবে এই নির্দিষ্ট ক্রসিংয়ে রংয়ের কারণে মোটরসাইকেল স্কিড বা অন্য কোনও যানবাহন দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

সান ফ্রান্সিসকো, আমেরিকা
আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোর কাস্ত্রো জেলায় ২০১৪ সালে তৈরি করা হয়েছিল রামধনু রঙের ক্রসিং। এই এলাকাটি LGBTQ+ সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। তবে এই নির্দিষ্ট ক্রসিংয়ে রঙের কারণে বাইক পিছলে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
টরন্টো, কানাডা
কানাডার টরন্টো শহরের Church Street এবং Alexander Street-এর সংযোগস্থলেও রয়েছে রামধনু রঙের ক্রসিং। ২০১৪ সালে এটি তৈরি করা হয়। অন্টারিও প্রদেশের প্রথম স্থায়ী রামধনু ক্রসিং হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটি। তবে এখানেও রঙিন রাস্তার কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বা বাইক স্কিড করার নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সিয়াটেল, আমেরিকা
আমেরিকার সিয়াটেলের ক্যাপিটল হিল এলাকায় ২০১৫ সালে তৈরি হয়েছিল রামধনু রঙের ক্রসিং। Broadway ও Pine Street-এর সংযোগস্থলে এই রঙিন ক্রসিং তৈরি করা হয়। ওয়াশিংটনের প্রথম স্থায়ী রামধনু ক্রসিং হিসেবে এটি পরিচিত। এই নির্দিষ্ট জায়গায় রঙের কারণে বাইক বা গাড়ি পিছলে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফিলাডেলফিয়া, আমেরিকা
আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতেও রয়েছে রামধনু রঙের রাস্তা। ২০১৫ সালে 13th Street এবং Locust Street-এর সংযোগস্থলে এই ক্রসিং তৈরি করা হয়। পেনসিলভানিয়া প্রদেশের প্রথম রামধনু ক্রসিং হিসেবে পরিচিত এটি। তবে এই ক্রসিংয়েও রঙের কারণে বাইক স্কিড বা যানবাহন দুর্ঘটনার কোনও নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
কলকাতার ঘটনা কেন আলাদা?
কলকাতার ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। বিদেশের অধিকাংশ শহরে রামধনুর রং ব্যবহার করা হয়েছে জেব্রা ক্রসিং বা পথচারীদের নির্দিষ্ট অংশে। কিন্তু কলকাতায় ফ্লাইওভার ও যানবাহন চলাচলের রাস্তার দীর্ঘ অংশজুড়ে বিভিন্ন রং ব্যবহার করা হয়েছে।
বৃষ্টির মধ্যে চিংড়িহাটা ফ্লাইওভারে একাধিক বাইক স্কিড করার ঘটনা সেই কারণেই প্রশ্ন তুলেছে। রাস্তার রঙের উপাদান, উপরিভাগের ঘর্ষণক্ষমতা এবং বৃষ্টির সময়ে টায়ারের গ্রিপ কতটা বজায় থাকছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে কি কলকাতার ঘটনা বিশ্বে নজিরবিহীন?
কলকাতার রামধনু রঙের রাস্তায় বাইক দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের অন্য কোথাও কি রাস্তায় রং করার কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে? আবার রঙিন রাস্তার উপর দুর্ঘটনা ঘটলেই রঙের কারণে দুর্ঘটনা হয়েছে, এমনটা প্রমাণিত হয় না।