
কলকাতা মেট্রো রেলের ৩৭তম জন্মদিনে ‘অবসর’ নিচ্ছে নন-এসি রেকগুলি।১৯৮৪ সালে, আজ থেকে ৩৭ বছর আগে কলকাতায় প্রথম চালু হয় মেট্রো রেলের পরিষেবা। সে সময় লোকে একে ‘পাতাল রেল’ বলেই ডাকতেন। আসলে, তখন গোটা মেট্রো রেল পরিষেবাটাই মাটির নীচে কাটা সুরঙ্গের মধ্যে দিতে চালু ছিল বলে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখায় এটিকে প্রথম ‘পাতাল রেল’ বলে উল্লেখ করা হয়। তার পর হয়তো এই নামই লোকের মুখে মুখে ঘুরে জনপ্রিয় হয়ে যায়।
শহরের ব্যাস্ত রাস্তায় যখন জ্যাম-জটে নাকাল নিত্যযাত্রীরা, তখন তিলোত্তমার পাতাল জুড়ে পাতা লাইন ধরে সুরঙ্গের মধ্যে দিয়ে ছুটছে যাত্রী বোঝাই ট্রেন। এখানে ট্রাফিক জ্যামের সমস্যা নেই, নেই ভিড়-ভাট্টার ভয়। তাই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘পাতাল রেল’। এখনকার মতো এসি রেক বা এসি ট্রেন তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেন না। এসি তো দূর, সে সময় মাটির নীচে ট্রেন চলছে, এটাই তো একটা নতুন, বিরাট বিস্ময়কর ব্যপার!
কলকাতার পাতাল রেলই হল দেশের প্রথম মেট্রো রেল পরিষেবা। ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবরের পরবর্তী ২৫ বছর একটানা কলকাতার সুরঙ্গ দিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছে ফিকে হলদেটে রঙের নন-এসি মেট্রো রেকগুলি।

এর পর ২০০৯ সালে কলকাতায় প্রথম এসি রেক চালু হয়। পাতাল রেলে ট্রাফিক জ্যামের সমস্যা না থাকলেও ভিড়ের চাপ ততদিনে অনেকটাই বেড়েছে। তাই ভিড়ে গলদঘর্ম যাত্রীদের কাছে অত্যন্ত পছন্দের হয়ে ওঠে হাতেগোনা মেট্রো রেলের এসি রেকগুলি। অফিসে যাওয়ার বা ফেরার সময় এসি মেট্রোয় চড়বেন বলে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা নন-এসি ট্রেনে ওঠা এড়িয়ে যেতে শুরু করেন অনেকেই।

ধীরে ধীরে নন-এসি রেকের জায়গা দখল করে নিতে থাকে আধুনিক ও তুলনামূলক ভাবে আরামদায়ক এসি মেট্রো। কখনও যন্ত্র বিকল, তো কখনও যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজনে কলকাতা মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ নন-এসি রেক একটা একটা করে বাতিল করে তার জায়গায় আরামদায়ক এসি রেক দেওয়া শুরু হল। দেখতে দেখতে এখন নন-এসি রেকের তেমন আর দেখা মেলে না। তার জায়গায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আধুনিক, ঝাঁ-চকচকে, আরামদায়ক এসি রেকগুলি। অফিস যাতায়াতের পথে কখনও-সখনও দু’-একটা নন-এসি রেক চোখে পড়লেও সেগুলি তার রঙের মতোই ফিকে লাগে।

অবেশেষ কলকাতা মেট্রো রেলের ৩৭তম জন্মদিনে ‘অবসর’ নিচ্ছে বয়সের ভারে নড়বড়ে নন-এসি রেকগুলি। এ বার তার বিদায় নেওয়ার পালা। কলকাতা মেট্রো রেল সূত্রে খবর, কর্তৃপক্ষের হাতে বর্তমানে হাতে মোট ২৭টি এসি রেক আছে। সারাদিন পরিষেবা চালু রাখার জন্য যা যথেষ্ট! তাই এবার পাকাপাকি ভাবে লাইন ছেড়ে দিতে হবে পুরনো নন-এসি রেকগুলিকে। তার জন্য 'ফেয়ারওয়েল'-এর আয়োজনও করা হয়েছে কলকাতা মেট্রো রেলের পক্ষ থেকে।

২৪ অক্টোবরের পর শহরের কোনও মেট্রো স্টেশনেই আর দেখা যাবে না অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত আর অগনিত টুকরো প্রেমের সাক্ষী, পুরনো হলদেটে নন-এসি রেকগুলিকে। বছর দশেক আগে কলকাতার মানুষ যে ভাবে স্টেশনে দাঁড়িয়ে এসি রেকের জন্য অপেক্ষা করতেন, ২৪ অক্টোবরের পর কি এই নন-এসি রেকগুলিকে ‘মিস’ করবেন, এগুলির অভাব বোধ করবেন! এর উত্তর জানা নেই।