কলকাতার ফ্ল্যাট দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট বিক্রি কমলেও কলকাতায় বাড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলকাতায় বাড়ি বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪% বেড়েছে। কিন্তু দেশের আবাসন বাজারের সামগ্রিক ছবিটা ততটা স্বস্তির নয়। আটটি বড় শহর মিলিয়ে বাড়ি বিক্রি প্রায় একই জায়গায় রয়েছে, অথচ নতুন বাড়ির লঞ্চ বিক্রির তুলনায় বেশি হচ্ছে। ফলে বাড়ি বিক্রি হতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিক্রি না হওয়া বাড়ির চাপও বাড়ছে।
কলকাতায় জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাড়ি বিক্রি বেড়েছে ৪%। অর্থাৎ দেশের আটটি বড় আবাসন বাজারের মধ্যে কলকাতায় এখনও ইতিবাচক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে সব ধরনের বাড়ির চাহিদা একই রকম রয়েছে। জাতীয় রিপোর্টের পরিসংখ্যান বলছে, শহর এবং বাড়ির দামের সেগমেন্ট অনুযায়ী বাজারের গতি যথেষ্ট বদলাচ্ছে। কলকাতার ৯ মাসের বিক্রির বৃদ্ধি সেই বৈচিত্র্যেরই একটি উদাহরণ।
ভারতের আবাসন বাজারের সামগ্রিক ছবিতে অবশ্য ধীরগতির ইঙ্গিত স্পষ্ট। Knight Frank India-র সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটটি বড় শহরে মোট ২,৫৮,২৩৮টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত।
কলকাতায় বাড়ি বিক্রি ৪% বৃদ্ধির পিছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। শহরের তুলনায় কিছুটা কম সম্পত্তির দাম এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন কলকাতাকে ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলছে। পাশাপাশি শহরতলি ও নতুন সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে নতুন আবাসন প্রকল্পের চাহিদা তৈরি হয়েছে। IT, পরিষেবা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানও আবাসনের প্রয়োজন ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে কম
এর মধ্যেই নতুন বাড়ি লঞ্চের গতি বিক্রির তুলনায় বেশি। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডেভেলপাররা ২,৭৯,৮৯৯টি নতুন বাড়ি বাজারে এনেছেন, যা এক বছর আগের তুলনায় ৪% বেশি।
নতুন লঞ্চ গত ১৬টি ত্রৈমাসিক ধরে বিক্রির চেয়ে বেশি রয়েছে। এর ফলে বাজারে বিক্রি না হওয়া বাড়ির চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি বাড়ি বিক্রি হতে কতটা সময় লাগছে, তার হিসাবও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে যেখানে একটি বাড়ি বিক্রি হতে গড়ে ৫.৮ কোয়ার্টার সময় লাগত, ২০২৬ সালের Q3-তে তা বেড়ে হয়েছে ৬.১ কোয়ার্টার।
এটি টানা চতুর্থ ত্রৈমাসিক যেখানে বাড়ি বিক্রির সময় বেড়েছে এবং Q2 2023-এর পর এটাই সর্বোচ্চ স্তর। সহজ কথায়, বাড়ি বিক্রি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ক্রেতা খুঁজে পেতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।
দিল্লি-NCR-এ সবচেয়ে বড় ধাক্কা
দেশের বড় আবাসন বাজারগুলির মধ্যে দিল্লি-NCR-এ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত NCR-এ ৩৫,৫৭৪টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১% কম। আটটি বড় বাজারের মধ্যে একমাত্র NCR-এই বাড়ি বিক্রি কমেছে।
বিশেষ করে প্রিমিয়াম সেগমেন্টের পতন বেশি। ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা দামের বাড়ির বিক্রি ৩৯% কমে হয়েছে ৪,০৩৩টি। অথচ একই সময়ে এই দামের ৫,০০২টি বাড়ি নতুন করে লঞ্চ হয়েছে। অর্থাৎ এই সেগমেন্টে যত বাড়ি বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি নতুন বাড়ি বাজারে এসেছে।
মুম্বই, বেঙ্গালুরুতে বিক্রি বাড়ল
তবে সব শহরে আবাসন বাজারের গতি এক নয়। মুম্বইয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে ৭২,৮০৪টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ১% বেশি। বেঙ্গালুরুতে বিক্রি বেড়েছে ৫%, মোট ৪৩,১৪০টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে। কলকাতায় বিক্রি বেড়েছে ৪%। হায়দরাবাদ ও আহমেদাবাদে বিক্রি বেড়েছে ২% করে। অন্যদিকে পুনের বাজার প্রায় গত বছরের জায়গাতেই রয়েছে।
অর্থাৎ দেশজুড়ে আবাসন বাজারে চাহিদা একেবারে উধাও হয়ে যায়নি। বরং কোন শহর এবং কোন দামের বাড়ি, তার উপর বাজারের গতি অনেকটাই নির্ভর করছে।
৫০ লক্ষের কম দামের বাড়িতে বেশি ধাক্কা
দামের হিসেবে সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা যাচ্ছে কম দামের বাড়িতে। ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে ৫০ লক্ষ টাকার কম দামের বাড়ির বিক্রি ১৪% কমে হয়েছে ৪৭,৬৬০টি।
৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা দামের বাড়ির বিক্রিও কমেছে। এই segment-এ পতন হয়েছে ৫.৯%। কিন্তু ছবিটা বদলে যাচ্ছে দামী বাড়ির ক্ষেত্রে। ১ কোটি থেকে ২ কোটি টাকা দামের বাড়ির বিক্রি বেড়েছে ৬.৮%, মোট ৭৭,০৮৭টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে। ২ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা দামের বাড়ির বিক্রি বেড়েছে আরও ১৯.৪%।
এর ফলে মোট রেসিডেন্সিয়াল সেলসের মধ্যে ১ কোটি টাকার বেশি দামের বাড়ির অংশ এখন ৫৫%, যা আগে ছিল ৫০%।
দাম কিন্তু কমছে না
বিক্রির গতি কমলেও এখনই আবাসনের দাম পড়ে যাওয়ার কোনও ছবি নেই। রিপোর্ট অনুযায়ী, Q3 2026-এ সবকটি tracked market-এই রেসিডেন্সিয়াল প্রপার্টির বিক্রি বেড়েছে।
NCR এবং বেঙ্গালুরু বাদ দিলে অধিকাংশ শহরে বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৩% থেকে ৬%-এর মধ্যে। NCR-এর মধ্যে গুরগাঁওয়া দাম বেড়েছে ৪%, নয়ডায় ৭%, গ্রেটার নয়ডায় ১১% এবং গাজিয়াবাদে ১৪%।
আগামী দিনে বাজার কোন দিকে যাবে, তার ক্ষেত্রে আসন্ন উৎসবের মরসুম এবং RBI-এর অক্টোবরের নীতি ঘোষণার দিকে নজর থাকবে।