প্রতীকী ছবি ভারতের শহুরে মানুষের আয়, খরচ, সঞ্চয় আর ঋণের হিসাব বদলে দিচ্ছে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য। এতদিন মনে করা হত, দেশের সবচেয়ে বড় শহর মানেই সবচেয়ে বেশি খরচ। কিন্তু PRICE এবং Tata Sons-এর নতুন রিপোর্ট বলছে, ছবিটা এতটা সরল নয়। কোথাও আয় বেশি, কিন্তু খরচের প্রবণতা কম। আবার তুলনায় ছোট শহরের পরিবারও বড় শহরের পরিবারের চেয়ে বেশি খরচ করছে।
আর এই হিসাবেই নজরে আসছে কলকাতা। দেশের 'বিগ সিক্স' শহরের অন্যতম কলকাতা মোট ভোক্তা বাজারের নিরিখে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, চেন্নাই ও হায়দরাবাদ, এই ছয় শহর মিলে দেশের শীর্ষ ১০০ শহরের মোট ভোগব্যয়ের প্রায় ৪৬ শতাংশ তৈরি করে। কিন্তু কলকাতার আসল গল্পটা মোট বাজারের আকারে নয়, বরং মানুষ কীভাবে এবং কোথায় টাকা খরচ করছেন, সেখানে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদে একাংশের দাবি, রাজ্যে কর্মসংস্থান বা শিল্প সেভাবে না থাকলেও খরচ কমছে না মানুষের।
কলকাতার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে কোন কোন শহর?
PRICE-Tata Sons-এর The Many Urban Indias রিপোর্টে ২০২৫-২৬ সালের পরিবারপিছু আয় ও খরচের ছবি উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পরিবারপিছু খরচের হিসাবে দেশের একেবারে শীর্ষে নেই কলকাতা। বরং চণ্ডীগড়, তিরুবনন্তপুরম, ভাদোদরা, তিরুপুর ও সুরাতের মতো শহর কলকাতার চেয়ে অনেক বেশি খরচ করে।
তবে বড় মেট্রো শহরগুলির মধ্যে কলকাতার খরচের ধরন আলাদা। বিগ সিক্সের গড় পরিবার বছরে প্রায় ১৩.৫ লক্ষ খরচ করে। এই ছয় শহরের মধ্যে চেন্নাইয়ের পরিবারপিছু খরচের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, আয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করে সেখানকার পরিবারগুলি। অর্থাৎ কলকাতার মানুষ যে শুধু আয় করেন আর টাকা জমিয়ে রাখেন, তা নয়। শহরের বিপুল সংখ্যক পরিবার নিয়মিত তাদের আয়ের বড় অংশ বিভিন্ন প্রয়োজন ও পরিষেবায় ব্যয় করছে।
কোথায় যাচ্ছে কলকাতার মানুষের টাকা?
শহুরে ভারতের খরচের বড় অংশ এখনও তিনটি জায়গায়, খাবার, বাড়ি ও পরিবহণ। তবে গত এক দশকে খরচের ধরন বদলেছে। মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের পিছনে মোট ব্যয়ের অনুপাত কমেছে, অন্যদিকে পরিষেবা, শিক্ষা, পরিবহণ, বিনোদন এবং টেকসই পণ্যে খরচের সুযোগ বেড়েছে।
শীর্ষ ১০০ শহরের পরিবারগুলি এখন মোট খরচের প্রায় ৩১ শতাংশ খাবারের পিছনে ব্যয় করে। এক দশক আগে এই হার ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের হাতে থাকা টাকার একটা বড় অংশ এখন খাবারের বাইরের জিনিসে যাচ্ছে।
এই বদল কলকাতার মতো পুরনো বড় শহরেও স্পষ্ট। রেস্তোরাঁয় খাওয়া, অনলাইন শপিং, পরিবহণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিনোদন, মোবাইল ও ডিজিটাল পরিষেবা, সব মিলিয়ে শহুরে পরিবারের ইচ্ছাধীন খরচের ক্ষেত্রও বাড়ছে।
আয় কম হলেও খরচের প্রবণতা কেন?
এখানেই কলকাতার গল্পটা আরও আকর্ষণীয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, গড় বার্ষিক পরিবারের আয়ের হিসাবে বেঙ্গালুরু কলকাতার তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ এগিয়ে। বেঙ্গালুরু ও চণ্ডীগড়ে গড় পরিবারিক আয় প্রায় ২৮ লক্ষের কাছাকাছি। কলকাতার গড় আয় তার তুলনায় অনেক কম। তারপরও কলকাতার মানুষের খরচের ধরন শহরটির ভোক্তা বাজারকে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।
এর একটা বড় কারণ কলকাতার বিপুল জনসংখ্যা এবং পরিবারের সংখ্যা। মোট বাজারের আকার নির্ধারণে শুধু একটি পরিবারের খরচ নয়, কতগুলি পরিবার সেই খরচ করছে সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মজার তথ্য, বড় শহর মানেই বেশি খরচ নয়। এই রিপোর্টের সবচেয়ে বড় চমক এখানেই।
ভারতের সবচেয়ে বেশি পরিবারপিছু খরচ করা পাঁচ শহরের কোনওটিই বিগ সিক্সের মধ্যে নেই। চণ্ডীগড়, তিরুবনন্তপুরম, ভাদোদরা, তিরুপুর এবং সুরাত—এই পাঁচ শহর পরিবারপিছু খরচের তালিকায় সবার উপরে। চণ্ডীগড়ে গড় পরিবার বছরে প্রায় ১৯.২ লক্ষ খরচ করে। তারপরই রয়েছে তিরুবনন্তপুরম, ভাদোদরা, তিরুপুর ও সুরাত। অর্থাৎ মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা কলকাতার মতো নামী মেট্রো শহরগুলিও পরিবারপিছু খরচে এই শহরগুলির পিছনে।
কলকাতার মানুষ আসলে কোথায় খরচ করছেন?
কলকাতার ক্ষেত্রে বড় বিষয় হল, শহরের মানুষের খরচের একটা বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনের পাশাপাশি পরিষেবা এবং শহুরে জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।
পরিবহণ, বাড়িভাড়া ও ইউটিলিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাবার, পোশাক, বিনোদন, সব মিলিয়ে কলকাতার পারিবারিক খরচের একটা বড় অংশ শহরের পরিষেবা অর্থনীতিকে চালায়। এছাড়া কলকাতায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বছরে ১.৫ লক্ষ থেকে ৬ লক্ষ আয় করা পরিবারের অনুপাত বিগ সিক্সের মধ্যে কলকাতাতেই সবচেয়ে বেশি,প্রায় ৩৫.২ শতাংশ।
অর্থাৎ কলকাতার মানুষের কেনাকাটা শুধু ধনী পরিবারের গল্প নয়। বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার মিলে শহরের বিশাল ভোক্তা বাজার তৈরি করছে।
সুরাতের গল্প আরও আলাদা
এই তালিকায় সুরাত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবারপিছু খরচের পাশাপাশি সুরাত এখন নিজেই একটি বিশাল খরচের বাজার তৈরি করেছে। সুরাতের ভোক্তা বাজারের আকার প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। বিগ সিক্সের বাইরে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় খরচের বাজার। এমনকী সুরাতের গড় পরিবারপিছু কেনাকাটার প্রবণতা বেঙ্গালুরুর থেকেও বেশি। শহরটির টেক্সটাইল শিল্প, হিরে ব্যবসা এবং অভিবাসী উদ্যোক্তাদের আর্থিক উন্নতি এই ভোক্তা বাজার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
অর্থাৎ ভারতের শহুরে অর্থনীতিতে এখন শুধু মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা কলকাতার মতো মেগাসিটিই শেষ কথা নয়। ছোট ও মাঝারি শহরও দ্রুত ভোক্তা বাজারে উঠে আসছে।
শুধু আয় নয়, খরচের ধরনই আসল
এক্ষেত্রে বলে রাখা প্রয়োজন, বেঙ্গালুরু সবচেয়ে বেশি আয় করে। চণ্ডীগড় সবচেয়ে বেশি পরিবারপিছু খরচ করে। দিল্লি দেশের সবচেয়ে বড় খরচের বাজার। সুরাত বিগ সিক্সের বাইরে সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার তৈরি করেছে। আবার কলকাতা তুলনামূলক কম গড় আয় নিয়েও দেশের ছয় বড় শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খরচের বাজার হয়ে রয়েছে।