
তৃণমূলের দুই শিবিরের লড়াই, একপক্ষে মমতা অন্য শিবিরে ঋতব্রতকালীঘাট তৃণমূল না ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল, কোনটি প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস তা নিয়ে জোর চর্চা বাংলা তথা দেশের রাজনীতিতে। সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে দলের দুটি কার্যনির্বাহী কমিটি ((National Working Committee বা NWC) গঠিত হওয়ায়। একটিতে চেয়ারপার্সন হিসেবে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বা সন্দীপন সাহারা যে কমিটি গড়েছেন সেখানে 'অপসারিত' করা হয়েছে বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। এখানেই না থেমে তাঁরা এখন নিজেদেরই প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করছেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাঠখড় পোড়াতে হবে দুই পক্ষকেই। দুই গোষ্ঠীকেই আইনি লড়াইয়ে জড়াতে হবে। মমতা বা ঋতব্রতদের এখন লক্ষ্য থাকবে, দলের নির্বাচনী প্রতীক ও ফান্ড নিজেদের কব্জায় রাখা। কাদের হাতে সেসব যাবে, তার উত্তর তো সময়ই দেবে। কিন্তু তার আগে দেখে নেওয়া দরকার জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি বা NWC গঠন এবং চেয়ারপার্সন নির্বাচনের ক্ষেত্রে তৃণমূলের গঠনতন্ত্র বা সংবিধান ঠিক কী বলছে।
কালীঘাট শিবির চেয়ারপার্সন করেছে মমতাকে
সূত্রের খবর, ২২ জুন কালীঘাট তৃণমূলের তরফে নির্বাচন কমিশনকে তাদের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টি জানানো হয়। এই কমিটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও'ব্রায়েন, দোলা সেন, মহুয়া মৈত্র এবং কুণাল ঘোষ-সহ মোট ২৪ জন সদস্য রয়েছেন। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কমিটিতে মহিলা প্রতিনিধিদের রাখার যে শর্ত রয়েছে তাও পূরণ করা হয়েছে।
সেই কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে সই রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নথিতে ২২ জুনের তারিখ থাকলেও NWC-র সদস্যদের নাম ২০ জুন তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের দাবি,পুনর্গঠিত কমিটির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর অর্থ, ঋতব্রত শিবির কর্তৃক কমিটি পুনর্গঠন বা রদবদল করার আগেই মূল কমিটি যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল, সেটা কমিশনকে অবহিত করা।
এদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির ২২ জুন একটি হোটেলে বৈঠক করে। তাদের তরফেও তৃণমূলের NWC পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও কারা রয়েছেন সেই কমিটিতে, তালিকাটি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে দাবি করা হচ্ছে, বিরোধী শিবিরের কমিটিতে ৩০ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের তরফে অরূপ রায়কে চেয়ারপার্সনের পদে বসানো হয়েছে। বিরোধী শিবির চায়, মমতা যেন তৃণমূলের উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মার্চ মাসে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যর সই করা যে দলের সংবিধান বা গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই AITC-র নিয়ম-কানুন পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিল কালীঘাট শিবির। কীভাবে NWC গঠন হবে, চেয়ারপার্সন নির্বাচন কীভাবে হয় আরও কী কী নিয়ম রয়েছে, তার উল্লেখ ছিল সেখানে। তাই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বিধায়করা দলের ফান্ড নিজেদের হাতে রাখার বা কমিটি পুনর্গঠন করার দাবি করলেও, AITC-র গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাঁদের পদক্ষেপটি ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হতে পারে।

AITC-র সংবিধানে কী আছে?
AITC-র নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, NWC-তে ২০ জন সদস্য থাকবেন। দলের সংবিধানের ১২.এ (12.A) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হবে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন এবং আরও ১৯ জন সদস্য নিয়ে। এই ১৯ জনের মধ্যে ৯ জন সদস্যকে নির্বাচন করবে AITC-র কমিটি। এবং বাকিদের নিয়োগ করবেন চেয়ারপার্সন।
অর্থাৎ চেয়ারপার্সন NWC-র অর্ধেকেরও বেশি সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন। সেই ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। দলের সংবিধান অনুযায়ী, বাকি ৯ জন সদস্যকে AITC-র জাতীয় কমিটির মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও এমন কোনও ভোট কি আদৌ হয়েছিল? প্রশ্ন তুলেছেন মমতা-ঘনিষ্ঠরা
দলের সংবিধান অনুযায়ী, সংসদীয় দলের নেতা এবং বিভিন্ন রাজ্যে তৃণমূলের বিধায়ক দলের নেতারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই (পদাধিকারবলে) জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হবেন এবং তাঁরা অন্য সদস্যদের মতোই ভোট দেওয়ার পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। NWC সদস্যদের মধ্য থেকে কোষাধ্যক্ষ এবং সাধারণ সম্পাদকদের নিয়োগ করার ক্ষমতা চেয়ারপার্সনের রয়েছে।
একইসঙ্গে, দলের চেয়ারপার্সনের হাতে তৃণমূলের বিভিন্ন কমিটি ও শাখা সংগঠনগুলিকে ভেঙে দেওয়া, গঠন করা বা পুনর্গঠনের ক্ষমতাও ন্যস্ত রয়েছে। অর্থাৎ দলের সংবিধান চেয়ারপার্সনের পদটিকে অত্যন্ত ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছে।
তৃণমূলের চেয়ারপার্সনকে কে নির্বাচন করেন?
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, TMC-র চেয়ারপার্সন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচিত হন। নির্বাচনী মণ্ডলি বা ইলেক্টোরাল কলেজ বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই নির্বাচন সম্পন্ন হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১২, ২০১৭ এবং ২০২২ সালে চেয়ারপার্সন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তী নির্বাচন ২০২৭ সালে হওয়ার কথা।
অথচ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী NWC পুনর্গঠন করে চেয়ারপার্সনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানাচ্ছে, 'প্রতি পাঁচ বছর অন্তর TMC চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এমনকী যদি অনাস্থা প্রস্তাবও আনতে হয়, তাও চেয়ারপার্সনকে জানাতে হবে। প্রতিনিধিদের ডাকতে হবে। এক্ষেত্রে এর কোনওটিই ঘটেনি। ঋতব্রত যা করেছেন তা অবৈধ ও অসাংবিধানিক। আদালতে তা ধোপে টিকবে না।'

AITC-র এক প্রবীণ সদস্য 'ইন্ডিয়া টুডে'-কে বলেন, 'এই বৈঠকটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তাছাড়া, ঋতব্রতর মতো নেতারা তো প্রতিনিধিই নন। তাই এমন কোনও পরিবর্তন আনার ক্ষমতা তাঁদের থাকার প্রশ্নই ওঠে না।'
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা দলের আরেক প্রবীণ নেতা বলেন,'আপনি কোনও কোম্পানির অফিসে হুট করে ঢুকে দাবি করতে পারেন না যে সেটি আপনার। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।'
একজন সাংসদও মন্তব্য করেন, 'অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দুই-তৃতীয়াংশের কথা বলেছিলেন, তখন তাঁরা বিধায়ক বা সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশের কথা বোঝাননি। তাঁরা দলের অর্থাৎ প্রতিনিধিদের দুই-তৃতীয়াংশের কথা বলেছিলেন। প্রায় ১০০০ জন প্রতিনিধি ২০২২ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুনরায় চেয়ারপার্সন হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। অথচ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অধিকাংশ নেতাই প্রতিনিধি নন।'
AITC-র চেয়ারপার্সন নির্বাচন ২০২৭ সালে
চেয়ারপার্সন কীভাবে নির্বাচিত হবেন সেই প্রক্রিয়াও তৃণমূলের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ, 'বিভিন্ন রাজ্য থেকে নির্বাচিত AITC সদস্যরা সম্মিলিতভাবে একটি নির্বাচনী মণ্ডলী বা ইলেক্টরাল কলেজ গঠন করবেন। সেই নির্বাচনী মণ্ডলীই দলের চেয়ারম্যান বা চেয়ারপার্সনকে নির্বাচিত করবে।' যদি বিষয়টি নির্বাচনের পর্যায়ে গড়ায়, তবে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে।
আহ্বায়কের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে কী হবে?
কালীঘাট শিবিরের এক প্রবীণ নেতা বলেন, 'আমি গত তিনবারের ভোটপ্রক্রিয়া দেখেছি। যদি অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়, তবে চেয়ারপার্সনকে বিষয়টি জানাতে হবে। তারপর প্রতিনিধিদের তলব করতে হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে না জানিয়ে কীভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব?'
এদিকে অরূপ রায়কে নিজেদের চেয়ারপার্সন হিসেবে তুলে ধরছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা। তবে, তাঁদের পক্ষে যদি প্রতিনিধিরা না থাকেন, তাহলে AITC-র গঠনতন্ত্রই সেই পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।