Mukul Roy: SFI থেকে কংগ্রেস, তারপর TMC, BJP হয়ে TMC, শেষলগ্নে দলে থেকেও 'নির্দল', বঙ্গ রাজনীতির 'ভোট স্ট্র্যাটেজিস্ট'

'ক্রিজে পড়ে থাকলে ব্যাটে রান আসবেই'। ক্রিকেটপ্রেমী মুকুল রায় এমনটাই মনে করতেন। তাই তো SFI থেকে কংগ্রেস ঘুরে তৃণমূল থেকে BJP, ফের তৃণমূলে ঘরওয়াপসি, এই বর্ণময় রাজনৈতিক কেরিয়ারে তিনি দাপটের সঙ্গে ব্যাট করে গিয়েছেন। বিধায়ক হিসেবে ক্রিজে টিকে থাকলেন আমৃত্যু। কেমন ছিল তাঁর রাজনৈতিক ইনিংস?

Advertisement
SFI থেকে কংগ্রেস, তারপর TMC, BJP হয়ে TMC, শেষলগ্নে দলে থেকেও 'নির্দল', বঙ্গ রাজনীতির 'ভোট স্ট্র্যাটেজিস্ট'মুকুল রায়
হাইলাইটস
  • ক্রিকেটপ্রেমী মুকুল রায়ের মন্ত্র ছিল, 'ক্রিজে পড়ে থাকলে ব্যাটে রান আসবেই'
  • বর্ণময় রাজনৈতিক কেরিয়ারে তিনি দাপটের সঙ্গে ব্যাট করে গিয়েছেন
  • SFI থেকে কংগ্রেস ঘুরে তৃণমূল থেকে BJP, ফের তৃণমূলে ঘরওয়াপসি হয় তাঁর

৭২ বছর বয়সে প্রয়াত মুকুল রায়। দীর্ঘ রোগভোগের পর রবিবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বর্ণময় রাজনৈতিক কেরিয়ার ছিল তাঁর। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, তৃণমূল থেকে BJP হয়ে ফের তৃণমূল। তবু খাতায় কলমে তিনি ছিলেন BJP-রই বিধায়ক। কেন বঙ্গ রাজনীতিতে 'চাণক্য' বলা হত মুকুলকে? 

গত প্রায় ২ বছর ধরে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন মুকুল রায়। কার্যত কোমায় চলে গিয়েছিলেন তিনি। ছেলে শুভ্রাংশু জানাচ্ছেন, চোখের পলক পড়ত না তাঁর। রাইলস টিউব ছাড়া খেতেও পারতেন না। শয্যাশায়ী সেই মুকুল রায় রাজনীতির ময়দান থেকে দীর্ঘদিন অন্তরালে থাকলেও একটা সময় ছিলেন দাপুটে রাজনীতিবিদ। 

১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বীজপুরের কাঁচরাপাড়ায় জন্ম। মফসসলের ছেলে মুকুল কাঁছরাপাড়া হর্নেট হাইস্কুল থেকে পড়াশোনা করেন। নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন। এরপর কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর পাশ। ত্রিকেট পাগল মুকুল রায়ের রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু হয়েছিল কলেজে। বাম ছাত্র সংগঠন SFI-এ হাতেখড়ি হয় তাঁর। এরপর কংগ্রেস নেতা আবু সিংহরায়ের হাত ধরে হাত শিবিরে নাম লেখান। এরপর তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে। ছিলেন অঘোষিত 'সেকেন্ড ইন কমান্ড'। 

Mukul Roy
মুকুল রায়

২২ গজের খেলাপ্রেমী মুকুল রাজনীতির 'খেলা'টাও শিখে ফেলেছিলেন দ্রুতই। তিনি মনে করছেন, 'ক্রিজে পড়ে থাকলে ব্যাটে রান আসবেই।' আর তাই ১৯৯২ সালে মমতা যখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদের জন্য সোমেন মিত্রর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তখন মুকুল মমতারই পক্ষে ছিলেন। কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে তৃণমূল গঠনেও মমতার সঙ্গে যোগ্য পার্টনারশিপ ছিল তাঁর। তাই আস্থাভাজন মুকুলকেই মমতা সঁপেছিলেন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। 

ক্রিজে টিকে থাকার সুবাদেই ২০০৬ সালে মমতা মুকুলকে পাঠান রাজ্যসভায়। ২০০৯ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের জোটের ক্ষেত্রে সেতুবন্ধনের কাজ করেছিলেন তিনি। ফলস্বরূপ পেয়েছিলেন জাহাজ প্রতিমন্ত্রীর পদ। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে ছিলেন মমতার ছায়াসঙ্গী। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বীজপুর থেকে বিধায়ক হন মুকুল পুত্র শুভ্রাংশু। ২০১২ সালে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মুকুল। তবে মমতা UPA সরকার ত্যাগ করায় পরের বছরই মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয় মুকুলকেও। 

Advertisement

Mukul Roy
ফাইল ফটো

বিভিন্ন দল থেকে নেতা-কর্মীদের তৃণমূলে নেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন মুকুলই। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে ৩৪টি আসন জিতেছিল তৃণমূল। তারপর থেকেই রাজনীতির 'চাণক্য' বলা শুরু হয় এই নেতাকে। 

কিন্তু ২০১৫ সালে আচমকাই দলের সঙ্গে মতভেদ শুরু হয় তাঁর। সারদা মামলায় নাম জড়ায় মুকুলের। কানাঘুষো শুরু হয় এই মামলা থেকে বাঁচতেই BJP-র দিকে ঝুঁকছেন তিনি। যদিও ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে মুকুলকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সহ সভাপতির পদ দেওয়া হয়। সেই ভোটে ২০০-র বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরেন মমতা।  

Mukul Roy
মমতা ও মোদীর সঙ্গে মুকুল রায়

২০১৭ সালের অক্টোবরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন মুকুল। নভেম্বরে দিল্লিতে গিয়ে যোগ দেন BJP-তে। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বাংলায় আসন বাড়ে তাদের। নেপথ্য কারিগর ছিলেন মুকুলই। তৃণমূল ভাঙানোর খেলায় তাঁর ‘হাতযশ’ ছিল বলেই রটে যায় সে সময়। একে একে বহু তৃণমূল নেতা ২০২১ সালের আগে BJP-তে যোগদান করেন। বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর আসন থেকে ৩০ হাজার ভোটে জেতেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সেটাই তাঁর প্রথম ভোটে জয়। 

২০২১ সালের ফল ঘোষণা হয়েছিল ২ মে। ১১ জুন তিনি ফিরে যান তৃণমূলে। বিধানসভার ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’র চেয়ারম্যান করা হলেও কিছু দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করেছিলেন।  তবে বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দেননি। ফলে তৃণমূলে যোগ দিলেও মুকুল খাতায়কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই থেকে গিয়েছিলেন।  তাঁর বিধায়কপদ খারিজের মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট বিধায়ক পদ খারিজের রায় দিলেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আমৃত্যু রয়ে গেলেন বিধায়ক হয়েই। 

Mukul Roy
কুণাল ঘোষের পোস্ট

অসুস্থতার জেরে স্মৃতিবিস্মৃত হয়েছিলেন মুকুল। তিনি তৃণমূলে আছেন না BJP-তে তা অধিকাংশ সময়েই গুলিয়ে ফেলতেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে একবার বলেছিলেন, 'তৃণমূল মানেই তো BJP।' রাজনৈতিক কারবারিদের মতে, টেস্ট ক্রিকেটের ভক্ত মুকুল রাজনীতির ২২ গজে যেভাবে ছাপ ফেলেছিলেন, টি-২০ জমানায় সেই দাপট হারিয়ে ফেলেন। 


 

 

POST A COMMENT
Advertisement