প্রতীকী ছবিকলকাতায় এলপিজি সঙ্কট ক্রমশ তীব্র আকার নিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শহরের বিকল্প জ্বালানির বাজারে। বেহালার বুড়োশিবতলা এলাকার প্রায় ৪০ বছরের পুরনো একটি কেরোসিন তেলের দোকানে বৃহস্পতিবার একদিনেই প্রায় ৬০০ লিটার তেল বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। সাধারণত যেখানে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ লিটার কেরোসিন বিক্রি হয়, সেখানে এই অস্বাভাবিক চাহিদা পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরছে।
দোকানদার জানিয়েছেন, সাধারণ দিনে তাঁর দোকানে ১০ থেকে ১২ জন রেশন কার্ডধারী ক্রেতা আসেন। কিন্তু গত ১২ মার্চ সকাল থেকেই দোকানের সামনে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এত বেশি চাহিদা তৈরি হয় যে অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের মজুত শেষ হয়ে যায় এবং অনেক ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয়।
দোকানিরা আরও জানিয়েছেন, তাঁরা সাধারণত প্রতিদিন ৫০-৬০ লিটার তেল বিক্রি করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার প্রায় ৬০০ লিটার বিক্রি হয়েছে। আরও অন্তত দু’টি ব্যারেল তেল বিক্রি করা যেত, কিন্তু মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেককেই ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।
দোকানদাররা আরও জানান, অতিরিক্ত তেলের ব্যবস্থা করা এখনই সম্ভব নয়। কারণ রাজ্য সরকারের নির্ধারিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত কেরোসিন পাওয়া যায় না। প্রতিটি দোকানের জন্য সাধারণত দুই থেকে তিনটি ব্যারেল তেলের বরাদ্দ থাকে। তাঁর কথায়, এই বরাদ্দ সম্পূর্ণভাবে সরকারের নির্ধারণ অনুযায়ীই দেওয়া হয়।
ওই ডিলারের বক্তব্য, গত বছর তাঁর দোকানে কেরোসিন বিক্রি ছিল গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে দোকানে মজুত থাকা তেলও বিক্রি হয়নি। কিন্তু চলতি বছরের এই সঙ্কটে পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে।
রেশন ডিলাররা জানাচ্ছেন, যে কেরোসিন বিক্রি হয়েছে, তার অনেকটাই গত এক-দু’মাস ধরে দোকানে পড়ে ছিল। আগে কেরোসিনের চাহিদা খুব কম ছিল বলেই তাঁরা মজুত রাখতেন না।
বর্তমানে কলকাতায় প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম প্রায় ৬৪.২০ টাকা। এলপিজি সরবরাহে সঙ্কট দেখা দেওয়ায় অনেকেই আবার এই পুরনো জ্বালানির দিকেই ঝুঁকছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও এই সঙ্কটের সঙ্গে পরোক্ষ যোগ রয়েছে। আমেরাকি ও ইরানের মধ্যে চলা উত্তেজনার প্রভাব জ্বালানি সরবরাহে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর জেরে দেশে বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালি, দু’ক্ষেত্রেই এলপিজি ও সিএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
গত ১০ মার্চ কেন্দ্রীয় সরকার নির্দেশ জারি করে জানায়, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত নয় এবং বিশেষ ছাড়ের আওতায় পড়ে না, এমন বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ আপাতত বন্ধ রাখা হবে।
এরপর ১১ মার্চ ভোর থেকেই কলকাতায় এলপিজি সংকটের প্রকট প্রভাব দেখা দিতে শুরু করে। বহু গ্রাহক অভিযোগ করেন, গৃহস্থালি এলপিজি সংক্রান্ত বেশিরভাগ হেল্পলাইন নম্বরই কাজ করছিল না। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের সরবরাহ বন্ধ এবং গৃহস্থালি সরবরাহে রেশনিং চালুর জেরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে অনেকেই রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছেন। শহরের বিভিন্ন দোকানে ইন্ডাকশন কুকটপের চাহিদা হঠাৎই বেড়ে গেছে এবং অনেক জায়গায় তা দ্রুত ফুরিয়েও যাচ্ছে। কলকাতার বহু বাসিন্দা এখন দৈনন্দিন রান্নাবান্না চালাতে বিকল্প জ্বালানির সন্ধানে ছুটছেন।