ফাইল ছবিঅস্তিত্ব সঙ্কটে পার্সিরা, সূত্রে এমনটাই জানা যাচ্ছে। জানা গেছে, কলকাতায় পার্সি সম্প্রদায়ের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪৭। যা ১৯৮০-র দশকের পর সর্বনিম্ন। এই চিত্র শুধু শহরের নয়, গোটা দেশজুড়েই পার্সিদের ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার এক স্পষ্ট প্রতিফলন। একসময় যেখানে এই শহরে প্রায় ১,৬০০ পার্সির বাস ছিল, আজ সেখানে সংখ্যা নেমে এসেছে উদ্বেগজনক স্তরে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পার্সিরা কলকাতায় বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও জনসংখ্যাগত কারণে তাঁদের সংখ্যা দ্রুত কমে গিয়েছে। একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, কলকাতার পার্সি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০-৪০ শতাংশই অবিবাহিত। আবার ৩৫-৪০ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে। এর পাশাপাশি, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পার্সি নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরের সঙ্গীকে বেছে নিয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই সম্প্রদায়ে মৃত্যুহার জন্মহারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। প্রতি বছর গড়ে জন্মের তুলনায় প্রায় ২০০ জন বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ফলে, পার্সিদের অস্তিত্ব সঙ্কট ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে।
সমস্যা আরও জটিল হয়েছে কিছু সামাজিক নিয়মের কারণে। যেমন, কোনও পার্সি নারী যদি সম্প্রদায়ের বাইরে বিয়ে করেন, তবে তাঁর সন্তানকে পার্সি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। অথচ, কোনও পার্সি পুরুষের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ফলে নতুন প্রজন্মের সংখ্যা বাড়ার পথ আরও সঙ্কুচিত হচ্ছে।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতে পার্সিদের সংখ্যা ছিল ৫৭,২৬৪, যা ১৯৪১ সালের ১,১৪,০০০ থেকে প্রায় অর্ধেক। পার্সিরা মূলত মুম্বই, গুজরাট এবং কলকাতায় বসবাস করেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্র সরকার ২০১৩-১৪ সালে ‘জিও পার্সি’ প্রকল্প চালু করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে থাকা নিঃসন্তান পার্সি দম্পতিদের সন্তানধারণের চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ বহন করা হয়। প্রথমদিকে এই প্রকল্পে উৎসাহ থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তার গতি অনেকটাই কমে গিয়েছে। গত পাঁচ বছরে এই প্রকল্পের আওতায় ২৩২টি শিশুর জন্ম হয়েছে।
কলকাতায় এই প্রকল্প খুব একটা সফল হয়নি, কারণ এখানে প্রজনন-সক্ষম বয়সের পার্সিদের সংখ্যা অত্যন্ত কম।বিশেষজ্ঞদের মতে, দেরিতে বিয়ে, অবিবাহিত থাকা, কম জন্মহার এবং বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাই এই সংকটের প্রধান কারণ।
পার্সি সম্প্রদায়ের শিকড় রয়েছে অষ্টম শতাব্দীতে, যখন জরোস্ট্রিয়ান শরণার্থীরা গুজরাট উপকূলে এসে বসতি স্থাপন করেন। এই ছোট্ট সম্প্রদায় থেকেই উঠে এসেছেন জে.আর.ডি. টাটা, হোমি জে. ভাবা এবং জুবিন মেহতার মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব।
বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সঙ্কট কাটাতে হলে সামাজিক প্রথার পরিবর্তন এবং সরকারি উদ্যোগ, দুটিই জরুরি। সম্প্রদায়ের ভেতরেও সচেতনতা বাড়ানো দরকার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং এই ঐতিহ্যবাহী গোষ্ঠীটির অস্তিত্ব রক্ষা করা যায়।