মমতা ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ছাব্বিশের নির্বাচনী প্রচারের সময়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন যে, তাঁর হাত থেকে ক্ষমতা, আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ তাঁর কথা মতো কাজ করছে না। এমনকি এক সভার শেষে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, 'আবার দেখা হবে, যদি বাগান থাকে ফুল ফুটবে, যদি তৃণমূল থাকে আবার দেখা হবে।'
ভোটের ফল প্রকাশের পর পরিষ্কার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই আশঙ্কা অমূলক ছিল না। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যে তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই শেষ কথা ছিলেন সেই দলেই তাঁর জায়গা এখন টলমল। তাঁর হাতে এখন দলের নিয়ন্ত্রণ নেই। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবির শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তো বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতিও দিয়েছেন স্পিকার। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপক্ষে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, লড়াই করে ৩৪ বছরের বাম শাসনকে যে মমতা একাই কার্যত উপড়ে ফেলেছিলেন, তিনিই এখন অস্তিত্বের সঙ্কটে। তাঁকে যেন অগ্নিপরীক্ষা দিতে হচ্ছে। তাও আবার নিজেরই দলের অন্দরে।
মমতা ও তাঁর দলের বিরোধী শিবিরের এই পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকেই মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরে ও শরদ পওয়ারের দলভাঙনের ঘটনার তুলনা টানছেন। আবার দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল থেকেও নেতাদের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনার কথাও উল্লেখ করছেন কেউ কেউ।
আদালত ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
এখন প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক (ঘাসফুল) নিয়ে ভবিষ্যতে কোনও আইনি লড়াই শুরু হবে কি না। অতীতে শিবসেনা, এনসিপি এবং লোক জনশক্তি পার্টির ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, দলীয় বিভাজনের পর নির্বাচন কমিশনই প্রকৃত দলের স্বীকৃতি নির্ধারণ করেছে।
একনাথ শিন্ডের শিবসেনা এবং অজিত পাওয়ারের এনসিপিকে নির্বাচন কমিশন বৈধ গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ফলে উদ্ধব ঠাকরে ও শরদ পাওয়ারকে নতুন নামে দল পরিচালনা করতে হয়। সেই নজির সামনে রেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
যদিও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতে গেলে বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে, স্পিকার কত দ্রুত বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিলেন, সেই সিদ্ধান্তে সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা বিচারাধীন হতে পারে।
স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
মহারাষ্ট্রের শিবসেনা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, বিধায়ক দলের নেতা শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারেন না। মূল রাজনৈতিক দলের অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষে চিঠি দেওয়ার পর স্পিকার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেন। একইসঙ্গে তাঁকে বিরোধী দলনেতার কক্ষও বরাদ্দ করা হয়। স্পিকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, স্পিকার বিধানসভার পরিচালক। তিনিই সর্বময় কর্তা। তবে রাজনৈতিক ব্যক্তি নন। তাঁর পদ সাংবিধানিক। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি আরও সময় নিতে পারতেন। আইনি দিক খতিয়ে দেখার পরই ঋতব্রতকে বিরোধী দলের নেতার কুর্সি দিতে পাতেন। এক্ষেত্রে হয়তো একটু তাড়াহুড়ো হয়েছে।
অভিষেক-বিরোধিতার প্রভাব
বিদ্রোহী শিবির প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনও দলের নেতা হিসেবে স্বীকার করলেও, তারা চাইছে তিনি সক্রিয় নেতৃত্ব ছেড়ে পরামর্শদাতার ভূমিকায় চলে যান। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদ্রোহের মূল কেন্দ্রবিন্দু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ক্ষোভ হলেও তার রাজনৈতিক প্রভাব পড়ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেই।
দলত্যাগ বিরোধী আইন ও বিদ্রোহী শিবির
দলত্যাগ বিরোধী আইনে বলা হয়েছে, কোনও দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক বা সাংসদ একসঙ্গে অবস্থান নিলে তাঁদের অযোগ্য ঘোষণা করা কঠিন। তবে সাধারণত এর জন্য অন্য কোনও দলে যোগদান বা একীভূত হওয়ার প্রশ্ন থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এখানে বিদ্রোহী বিধায়করা অন্য কোনও দলে না গিয়ে নিজেদেরই আসল তৃণমূল কংগ্রেস বলে দাবি করছেন। শিবসেনা ও এনসিপির ক্ষেত্রেও প্রথমে একই ধরনের দাবি সামনে এসেছিল।
আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের এই ঘটনা শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্কট নয়, দেশের অন্য আঞ্চলিক দলগুলোর জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে আগামী দিনে পঞ্জাবে আম আদমি পার্টি বা উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির মতো দলগুলোকেও অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে। সব মিলিয়ে, তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সঙ্কট আগামী দিনে আদালত, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক ময়দানে এক বড় লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।