কলকাতার স্টেশনে স্টেশনে ভুয়ো চাকরির ফাঁদ'এখন কটা বাজে?' বা 'পরের ট্রেন কখন আছে?' স্টেশনে দাঁড়িয়ে এই ভাবেই আলাপ শুরু করে তারা। অতি সাধারণ-নিরীহ মার্কা একটি বা দুটি প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নের ফাঁসে ফেঁসেই কয়েক হাজার টাকা খুইয়েছে কয়েকশো কলেজ ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে উঠতি যুবক যুবতিরা। গত কয়েক বছর ধরে ভরা শহরের মাঝে, দিনে দুপুরে রেল স্টেশনগুলিতে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন শহর ও মফস্বলের যুবক-যুবতিরা।
ঠিক কীভাবে চাকরির প্রতারণা ঘটছে?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বারাসত, মধ্যমগ্রাম, হৃদয়পুর, থেকে শুরু করে বিধাননগর পর্যন্ত বনগাঁ লাইন আবার অন্যদিকে সেই রানাঘা, কৃষ্ণনগর পর্যন্ত মেন লাইনে ছড়িয়ে পড়েছে এই চক্র। বাদ যাচ্ছে না ডানকুনির মতো লাইনগুলিও। মূলত স্টেশনগুলিতে কলেজের উদ্দেশে যাওয়া বা কলেজ ফেরত পড়ুয়া, সদ্য কলেজ পাশ করা উঠতি যুবক-যুবতিরাই এই প্রতারণা চক্রের টার্গেট। এদের জাল ছড়িয়েছে বহুদূর।
মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা অর্ণব রায় নামে এক যুবকের দাবি, তিনিও পড়েছিলেন এমন প্রতারণার ফাঁদে। মধ্যমগ্রাম স্টেশনেই ঘটেছিল সেই কাণ্ড। প্রথমে তারই সময়বয়সী একটি ছেলে নানা অছিলায় তাঁর সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করে। ট্রেনের কথা থেকে শুরু করে বাড়ির খোঁজ খবর নেওয়া থেকে শেষ পর্যন্ত মোবাইল নম্বরটি চেয়ে নেয় অভিযুক্ত। সেদিনের মতো সেখানেই থামে কুচক্রী 'অপারেশন'।
ঠিক পরের দিনই অভিযুক্ত যুবকের কাছ থেকে ফোন আসে অর্ণবের কাছে। বলা হয়, একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে আছে চাকরির শূন্যপদ। তার জন্য তাঁকে কিছুই করতে হবে না। শুধুমাত্র একবার কোম্পানিতে গিয়ে বসের সঙ্গে দেখা করলেই হয়ে যাবে চাকরি। অর্ণবের দাবি, সে প্রথমে যেতে রাজি না হলেও, পরে বিস্তর টালবাহনার পর ওই কোম্পানিতে যায় সে। কিন্তু দেখা যায় কোম্পানি বলে আদৌ কিছু নয়, একটি ভাড়া বাড়িতে কিছু লোক মিলে চালানো হচ্ছে ওই চক্র। যদিও প্রথমে ভাওতা বুঝতে পারেনি অর্ণবও। আর তাতেই ভুল করে বসে সে।
অর্ণবের দাবি, ওই কোম্পানির একজন লোক তাঁকে চাকরির অফার করে। কিন্তু চাকরির স্কিল তৈরির জন্য তাঁকে কিছু বই পড়তে হবে জানায়। বলা হয় কোম্পানিই সেই বই দেবে। তার জন্য কোম্পানিকে দিতে হবে মোট ২০ হাজার টাকা। অর্ণবের বক্তব্য সে ২০ হাজার টাকা দিতে অপারগ জানালে, ১০ হাজার টাকায় রফা করে ওই ব্যক্তি। দিন ২ পরে সত্যিই সে টাকাও দেয়। পরিবর্তে কিছু বই দেওয়া হয় তাঁকে।
যুবকের দাবি, বই দেওয়ার পর ৩ মাস কেটে গেলও চাকরি না পাওয়ায় অধৈর্য হয়ে পড়ে সে। ফের ওই কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই খুলে যায় ভুয়ো চাকরির পর্দা। তাঁর বক্তব্য, কোম্পানি থেকে তাঁকে বলা হয়, তার মতো এমন আরও ছেলে আনলে তবেই মাথা পিছু ৫ হাজার টাকা করে পাওয়া যাবে। এভাবেই নিজের টাকা সে পেতে পারে। এটাই হবে তাঁর কাজ। শুনে আকাশ ভেঙে পড়ে অর্ণবের মাথায়। শেষ পর্যন্ত ওই চক্র থেকে বেরিয়ে আসে সে।
এই একই অভিজ্ঞতা ঘটেছে বারাসত স্টেশনে তন্ময় সরকার নামে এক যুবকের ক্ষেত্রেও। তাঁর গল্পটা প্রায় একই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই যুবক টাকা দেননি। তবে সুব্রত বিশ্বাস নামে অপর এক যুবক কয়েক হাজার টাকা গচ্চা দিয়েছেন ওই কোম্পানিতে।
নজর রাখলে দেখা যায়, প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ভাবেই এমন ভাবেই এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন অথবা হতে হতে বেঁচেছেন, এমন অসংখ্য পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করছে। তবে কিছু লোক বর্তমানে যেমন সতর্ক ভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে আনছেন, তেমনই কিছু লোক আবার পড়ে যাচ্ছে এই প্রতারকদের ফাঁদেও। কিন্তু তাতে থানা পুলিশ বা কেস দায়ের প্রায় হচ্ছে না বলেই সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে।
প্রতারণার ফাঁদে পড়া একাধিক যুবক-যুবতীদের দাবি এগুলো সবগুলোই ভুয়ো। মূলত নেটওয়ার্ক মার্কেটিং, পিরামিড স্টাইল ধাঁচেই দিনের পর স্ক্যাম চালাচ্ছে ওই প্রতারক কোম্পানিগুলি। এক একটি জায়গায় অল্প কদিনের জন্য রুম ভাড়া নিয়ে একই ধাঁচে হাজার হাজার যুবক যুবতীদের ঠকিয়ে চলেছে প্রতারকরা।