Sudipta Sen Saradha Scam: একযুগ পরে জেলমুক্তি, সুদীপ্ত সেন, সারদা কাণ্ড এবং 'যা গেছে, তা গেছে...'

কিন্তু শুধু তৃণমূল কংগ্রেসই নন, সারদা চিটফান্ডে নাম জড়িয়েছিল অসমের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও কংগ্রেস নেতা মাতঙ্গ সিংয়েরও। তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই একের পর এক বিস্ফোরণ রাজনৈতিক যোগাযোগ সামনে আসতে থাকে। ওদিকে সর্বস্ব খুইয়ে তখন কাঁদছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এজেন্টরা আত্মহত্যা করছেন। টাকা ফেরত চেয়ে এজেন্টদের বাড়িতে ভাঙচুর করছে ক্ষুব্ধ জনতা। 

Advertisement
একযুগ পরে জেলমুক্তি, সুদীপ্ত সেন, সারদা কাণ্ড এবং 'যা গেছে, তা গেছে...'সুদীপ্ত সেন ও সারদা কাণ্ড
হাইলাইটস
  • সারদা গোষ্ঠী ও শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস
  • নাম জড়িয়েছিল হিমন্ত বিশ্বশর্মারও
  • কীভাবে শুরু হয়েছিল সুদীপ্ত সেনের সারদা চিট ফান্ড?

'যা গেছে, তা গেছে...' ২০১৩ সালের এপ্রিলের এক বিকেলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই প্রেস কনফারেন্স। লক্ষ লক্ষ মানুষে তখন সর্বস্ব খুইয়ে কাঁদছে। শেষ সঞ্চয়টুকুও ডুবে গিয়েছে বহু মানুষের। আজ যখন সুদীপ্ত সেনের জেলমুক্তি হতে চলেছে, তখন ফিরে দেখার সময় এসেছে সেই কুখ্যাত সারদা চিট ফান্ড কাণ্ড। আড়াই হাজার কোটি টাকার তছরূপ। 

দীর্ঘ ১২ বছর পর জামিন পেয়েছেন সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন। সব কিছু ঠিক থাকলে আজ অর্থাত্‍ বৃহস্পতিবারই হয়তো জেলমুক্তি হবে সুদীপ্ত সেনের। 

আপনারা 'ফির হেরা ফেরি' দেখেছেন? '২৫ দিন মে পয়সা ডাবল' স্কিম ছিল। সিনেমায় যা ঘটেছিল, সারদা কাণ্ডে বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটেছিল। মানুষকে বড় রিটার্নের লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলেছিল সুদীপ্ত সেন ও তার তৈরি সারদা গোষ্ঠী। বলতে দ্বিধা নেই, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বহু শীর্ষ নেতা সারদা গোষ্ঠীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রমোটও করেছিলেন। সেই বিশ্বাসেই গরিব মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা ঢেলেছিলেন সারদা চিট ফান্ডে। রাতারাতি ধনী হওয়ার চক্করে।

যে দিন গ্রেফতার করা হল সুদীপ্ত সেনকে
যে দিন গ্রেফতার করা হল সুদীপ্ত সেনকে

সারদা গোষ্ঠী ও শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস

সারদা চিটফান্ড শুধুই একটি প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বিশাল রাজনীতিও জড়িয়ে ছিল এই গোটা ঘটনায়। ভারতের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। যেখানে টাকা ও শাসকদলের ক্ষমতা, সব মিলেমিশে একাকার।  বছরের পর বছর ধরে সারদা কাণ্ডে সিবিআই (CBI)-এর জেরার মুখে পড়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ নেতা, সাংসদ, বিধায়ক থেকে শুরু করে দাপুটে মন্ত্রীরা। অভিনেত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী শতাব্দী রায় ছিলেন সারদার অন্যতম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর, আর তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ সামলাতেন এই গোষ্ঠীর প্রায় ৯৮৮ কোটি টাকার বিশাল মিডিয়া সাম্রাজ্য। এছাড়াও নাম জড়িয়েছিল সৃঞ্জয় বোস এবং তৎকালীন পরিবহণ মন্ত্রী মদন মিত্রেরও। বিশেষ করে মদন মিত্র যেভাবে এই গোষ্ঠীর কর্মী ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাতে রাজনীতি আর ব্যবসার মধ্যকার সীমারেখাটাই কার্যত মুছে গিয়েছিল।

Advertisement

সুদীপ্ত সেন
সুদীপ্ত সেন

নাম জড়িয়েছিল হিমন্ত বিশ্বশর্মারও

কিন্তু শুধু তৃণমূল কংগ্রেসই নন, সারদা চিটফান্ডে নাম জড়িয়েছিল অসমের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও কংগ্রেস নেতা মাতঙ্গ সিংয়েরও। তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই একের পর এক বিস্ফোরণ রাজনৈতিক যোগাযোগ সামনে আসতে থাকে। ওদিকে সর্বস্ব খুইয়ে তখন কাঁদছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এজেন্টরা আত্মহত্যা করছেন। টাকা ফেরত চেয়ে এজেন্টদের বাড়িতে ভাঙচুর করছে ক্ষুব্ধ জনতা। 

সারদা কাণ্ডে যখন গ্রেফতার হন তৃণমূল নেতা ও প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র
সারদা কাণ্ডে যখন গ্রেফতার হন তৃণমূল নেতা ও প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র

কীভাবে শুরু হয়েছিল সুদীপ্ত সেনের সারদা চিট ফান্ড?

সারদা কাণ্ডের আসলে বীজ রোপন হয়েছিল ২০০০ সালের কাছাকাছি। কিন্তু তখন সুদীপ্ত সেনকে কেউ চিনত না। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। কিছু বছরের মধ্যে দেখা গেল, সুদীপ্ত সেন হয়ে উঠলেন ধনকুবের। ২০০৬ সালে সারদা গোষ্ঠী নাম সংস্থা গড়ে তুললেন।  সারদা গোষ্ঠী অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এজেন্ট প্রথার মাধ্যমে তাদের ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছিল। এই ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারী আনতে পারলেই এজেন্টদের জন্য থাকত দামী দামী সব উপহার, যার পোশাকি নাম ছিল ‘কমেন্ডেশন গিফট’।

আমানত হারানো সেই মানুষগুলি
আমানত হারানো সেই মানুষগুলি

প্রকৃতপক্ষে, এই জালিয়াতি ছিল সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক পরিকল্পিত ছক। প্রশাসনের নজর এড়াতে সারদা গোষ্ঠী একাধিক সংস্থাকে নিজেদের জালে জড়িয়েছিল। এই কেলেঙ্কারির শিকড় লুকিয়ে ছিল গোষ্ঠীর সামনের সারির সংস্থাগুলির মধ্যে, যারা জনগণের কাছ থেকে বন্ড এবং ডিবেঞ্চার, যেমন সিকিওরড বন্ড এবং প্রেফারেনশিয়াল ডিবেঞ্চার ইস্যু করে বাজার থেকে বিপুল টাকা তুলেছিল। মা সারদার নামে নাম রাখা সারদা গোষ্ঠীর একটি স্কিম ছিল, ১ লক্ষ টাকা ঢাললে ১৪ বছরে রিটার্ন ১০ লক্ষ টাকা। গরিব মানুষ এই লোভেই পা দিয়েছিলেন। জমি বা ফ্ল্যাটের প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের টানত সারদা।

সারদা চিটফান্ডে টাকা ডুবে যাওয়া এক আমানতকারী
সারদা চিটফান্ডে টাকা ডুবে যাওয়া এক আমানতকারী

এজেন্টদের দেওয়া হত প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মোটা টাকা কমিশন, যার ফলে রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছিল এজেন্টদের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। ২০১০ সালের পর সারদা তাদের কৌশল বদলে ফেলে এবং পর্যটন, আবাসন ও মোটরসাইকেল তৈরির মতো ক্ষেত্রে ‘কালেক্টিভ ইনভেস্টমেন্ট স্কিম’ (CIS)-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০১১ সালে সেবি (SEBI)-র পক্ষ থেকে ফের সতর্কবার্তা দেওয়া হলে, তারা বড় অঙ্কের লিস্টেড শেয়ার কেনাবেচা শুরু করে। মূলত এর মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ অর্থ এমন সব ‘বেনামি’ অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়, যা বর্তমানে সিবিআই (CBI) তদন্তের আওতায় রয়েছে। কিন্তু এত কিছু করেও, ২০১০ সাল নাগাদ তাদের আর্থিক কাঠামোয় যে ফাটল ধরতে শুরু করেছিল, তা শেষ রক্ষা করতে পারেনি সারদা গোষ্ঠী।

আমানতকারীরা টাকা ফেরত পেয়েছেন?

ডুবে যায় লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর টাকা। যার পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১৩ সালেই শেষ হয়ে যায় সারদা গোষ্ঠীর সাম্রাজ্য। পালাতে গিয়ে কাশ্মীরের সোনমার্গে ধরা পড়েন সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখোপাধ্যায় (সারদা গোষ্ঠীর উচ্চপদস্থ আধিকারিক)। তারপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ১৩ বছর। একযুগেরও বেশি সময়। আমানতকারীরা টাকা ফেরত পেয়েছেন? আসলে 'যা গেছে, তা গেছে...'।

POST A COMMENT
Advertisement