
পশ্চিমবঙ্গে SIR এবং এখনও মুলতুবি থাকা শুনানিকে ঘিরে যে মামলা চলছে, তাতে ফের একটি আবেদন জমা পড়েছে। দেশের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এই আবেদনটিকেও আগামী ৫ অক্টোবরের শুনানির সঙ্গে যুক্ত করেছে। একইসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন দুই বিধানসভার উপনির্বাচনে ট্রাইব্যুনালে থাকা ভোটারদের বিষয় নিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের। উপনির্বাচনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) সংক্রান্ত মামলার শুনানির দিন এগোতে রাজি হল না দেশের শীর্ষ আদালত। তালিকা অনুযায়ী আগামী ৫ অক্টোবরই ওই মামলা শোনা হবে। কিন্তু রাজ্যের দুই কেন্দ্র নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে ৬ অক্টোবর বিধানসভার উপনির্বাচন রয়েছে। সেখানকার ১৮ হাজারের বেশি ভোটারের আবেদন ঝুলে আছে ট্রাইবুনালে। তাঁরা বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। ভোট দিতে পারবেন না। দেশের প্রধান বিচারপতি কান্ত অবশ্য বলেন, ‘এগুলো স্রেফ উপনির্বাচন। আর কিছু নয়।’
২২ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম কি ফের যুক্ত হবে?
আবেদনকারীর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব পরিসংখ্যানই SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। আবেদনে আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সেই ২২ লক্ষ মানুষ, যাঁদের আর্জি এখনও মুলতুবি রয়েছে, তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় ফের যুক্ত করাতে পারবেন কি না।
কারণ, নির্বাচন কমিশনের প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০টি রাজ্যে ‘Special Enrollment Drive’-এর মাধ্যমে পুনরায় নাম নথিভুক্ত করা এবং Form 6 পূরণ করা শুরু হবে।
Form 6-এর পরিসংখ্যানে কী দেখা যাচ্ছে?
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭ অগাস্ট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে Form 6-এর ৩৪.১৩ লক্ষ আবেদন পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ৭.০৭ লক্ষ নতুন নাম নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, Form 6-এর আওতায় ৭.২৬ লক্ষ আবেদন খারিজ করা হয়েছিল। প্রায় ২০ লক্ষ Form 6 আবেদন হয় প্রক্রিয়াধীন ছিল, নয়তো কোনও পদক্ষেপ ছাড়াই মুলতুবি ছিল।
Form 7-এর ক্ষেত্রে চিত্র আলাদা
Form 7-এর মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ৬.৩৯ লক্ষ Form 7 আবেদন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৫.৭২ লক্ষ আবেদনের ফল হিসেবে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মাত্র ১৪,৫০০টি Form 7 আবেদন খারিজ করা হয়েছিল।
আবেদনকারীর বক্তব্য, Form 6 এবং Form 7-এর আবেদনের ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। Form 6-এর ক্ষেত্রে মাত্র ২০.৭ শতাংশ আবেদনের ভিত্তিতে নাম নথিভুক্ত হয়েছে এবং ২১.৩ শতাংশ আবেদন খারিজ হয়েছে। উল্টোদিকে, Form 7-এর ৮৯.৬ শতাংশ আবেদনের মধ্যে মাত্র ২.৩ শতাংশ আবেদন খারিজ হয়েছে।
আবেদনকারীর মতে, এই ফলাফলের এত বড় পার্থক্য পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে।
নির্বাচন কমিশনের ২৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের প্রসঙ্গ
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, SIR-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বৈঠক হয়। এরপর কমিশনের তরফে একটি প্রেস বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়।
আবেদনকারীর বক্তব্য, ওই প্রেস বিবৃতিতে জানানো সিদ্ধান্তগুলি SIR প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করছে। একইসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে আবেদন সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালগুলির ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং কাজকর্ম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
Form 6-এর বাধ্যতামূলক ঘোষণায় পরিবর্তন
আবেদনে বলা হয়েছে, Form 6-এ আগে একটি বাধ্যতামূলক ঘোষণা ছিল। সেখানে আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় আবেদনকারী নিজে অথবা তাঁর বাবা-মা/দাদা-দিদা বা নানা-নানির নাম থাকার বিষয়টি উল্লেখ করতে হত।
এখন যেসব রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, সেখানে Form 6 থেকে ওই বাধ্যতামূলক ঘোষণা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবেদনে বলা হয়েছে, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গেও SIR প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ওই দুই রাজ্য-সহ ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অবিলম্বে একটি ‘Special Enrollment Drive’ শুরু করা উচিত বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার ধারাবাহিক সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায় SIR চলাকালীন বা তার পরে বাদ পড়ে যাওয়া যে কোনও ব্যক্তি বা প্রথমবারের ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আপিল করা ২২ লক্ষের বেশি ভোটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, SIR শেষ হওয়ার পর বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় নথিভুক্ত করার জন্য ‘Special Enrollment Drive’ ঘোষণা করা এবং একইসঙ্গে Form 6-এর নিয়মে পরিবর্তন আনা, এই দু’টি বিষয়ই নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়ার গুরুতর ঘাটতি ইঙ্গিত করে। আবেদনকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে বিভিন্ন রাজ্যে যোগ্য ভোটাররা ভোটার তালিকার বাইরে চলে গিয়েছেন।
এছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গে আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা ২২ লক্ষেরও বেশি বাদ পড়া ভোটার নির্বাচন কমিশনের প্রেস বিবৃতি অনুযায়ী Electoral Registration Officers বা ERO-দের কাছে পুনরায় নাম নথিভুক্ত করার জন্য আবেদন করতে পারবেন কি না, তা নির্বাচন কমিশন এখনও স্পষ্ট করেনি বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।