সিন্ডিকেট নেতারা বেপাত্তা, প্রমোটারদের স্বস্তি, কলকাতায় ফ্ল্যাটের দাম কি কমবে?

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল আবাসন শিল্পে। রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলির অভিযোগ, কলকাতা ও নিউ টাউনের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রতি বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়া হতো। প্রকল্পের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী এই অঙ্ক নির্ধারিত হতো। স্বাভাবিকভাবেই এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপরেই চাপানো হতো। ফলে আবাসনের দাম কৃত্রিমভাবে বেড়ে যেত বলে অভিযোগ।

Advertisement
সিন্ডিকেট নেতারা বেপাত্তা, প্রমোটারদের স্বস্তি, কলকাতায় ফ্ল্যাটের দাম কি কমবে?সংগৃহীত ছবি
হাইলাইটস
  • রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বহু বছর ধরে আলোচিত ‘সিন্ডিকেট রাজ’ নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
  • বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহেই নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহলের একাংশের দাবি, পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে।

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বহু বছর ধরে আলোচিত ‘সিন্ডিকেট রাজ’ নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহেই নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহলের একাংশের দাবি, পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগে যেখানে অভিযোগ জানালে পুলিশ অনেক সময় বিষয়টি ‘আপস করে মিটিয়ে নেওয়ার’ পরামর্শ দিত, এখন নাকি নির্মাতাদের স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে, তোলাবাজদের কোনও টাকা না দিতে।

ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি বড় নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক অফিসারের কথায়, গত কয়েক সপ্তাহে স্থানীয় সিন্ডিকেটের সদস্যদের আর দেখা যাচ্ছে না। তিনি জানান, আগে প্রতিদিন কত ট্রাক বালি লাগবে, তা নিয়ে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হতো। এখন সেই প্রয়োজন নেই। এমনকি এক সিন্ডিকেট নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আপাতত গ্রামে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন।

তবে সিন্ডিকেটের হঠাৎ অন্তর্ধানে কিছু জায়গায় সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছে। বাইপাসের একটি প্রকল্পে বালির অভাবে সংযোগকারী রাস্তার কাজ প্রায় ১০ দিন বন্ধ ছিল। পরে অন্য এক সরবরাহকারীর মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের দাবি, নতুন সরবরাহকারী নির্ধারিত পরিমাণ ও মান বজায় রেখেই সামগ্রী দিয়েছেন, যা আগে সবসময় পাওয়া যেত না।

তোলাবাজির পরিমাণ ছিল কোটি টাকায়
নির্মাণ শিল্পের একাধিক সূত্রের দাবি, সিন্ডিকেটের তোলাবাজির পরিমাণ ছিল বিপুল। বাইপাস সংলগ্ন প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে শুধুমাত্র সিন্ডিকেটকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দিতে হয়েছিল বলে অভিযোগ।

এক নির্মাণ সংস্থার কর্তার বক্তব্য, প্রকল্প শুরুর আগে স্থানীয় কয়েকটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে বৈঠকে বসতে বাধ্য হতে হয়েছিল। তারা শুধু বালি নয়, সিমেন্ট সরবরাহের দাবিও জানিয়েছিল। যদিও প্রকল্পে প্রয়োজনীয় রেডিমিক্স কংক্রিট বাইরে থেকে আসত, তবুও প্রতি কন্টেইনারের জন্য আলাদা টাকা দাবি করা হয়েছিল।

একটি স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত প্রকল্পে নাকি প্রতি কংক্রিট কন্টেইনারের জন্য ১,২০০ টাকা করে ‘ফি’ দিতে হয়েছে। সরাসরি ব্যবসা করতে না পারলেও প্রকল্পের লাভের ভাগ দাবি করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

Advertisement

বালির কারবারে ব্যাপক অনিয়ম
অভিযোগ, বালির ব্যবসায়ও ব্যাপক জালিয়াতি চলত। নির্মাতাদের কাছ থেকে পুরো টাকার বিল নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণের মাত্র ৭০ শতাংশ মাল সরবরাহ করা হতো। এক অফিসার জানালেন, চুক্তি অনুযায়ী যতটা বালি পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার অনেক কম দেওয়া হতো। কিন্তু প্রতিবাদ করার সুযোগ প্রায় থাকত না।

আবাসন খাতে বাড়তি চাপ
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল আবাসন শিল্পে। রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলির অভিযোগ, কলকাতা ও নিউ টাউনের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রতি বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়া হতো। প্রকল্পের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী এই অঙ্ক নির্ধারিত হতো। স্বাভাবিকভাবেই এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপরেই চাপানো হতো। ফলে আবাসনের দাম কৃত্রিমভাবে বেড়ে যেত বলে অভিযোগ।

সাধারণ মানুষও রেহাই পাননি
শুধু বড় নির্মাতা নয়, সাধারণ বাড়ির মালিকদেরও নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ। পাটুলির এক প্রবীণ দম্পতি বাড়ি রং করার জন্য একটি সংস্থাকে কাজ দিয়েছিলেন। কাজ শুরু হওয়ার পর কয়েকজন ব্যক্তি এসে এক লক্ষ টাকা দাবি করেন। না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

এলাকার আরেক বাসিন্দার দাবি, নতুন বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রতি বর্গফুটে ৩০ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। ফলে ৫,০০০ বর্গফুটের একটি বাড়ি তৈরি করতে গেলে নির্মাণ শুরুর আগেই প্রায় দেড় লক্ষ টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়ে যেত।

একাধিক কাউন্সিলর গ্রেফতার, কিন্তু মূল কাঠামো কি অটুট?
এ পর্যন্ত কলকাতা ও বিধাননগর পুর এলাকার অন্তত ১২ জন তৃণমূল কাউন্সিলরকে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে তোলাবাজি, বেআইনি অনুপ্রবেশ, ভয় দেখানো এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কাজ। তবে সমালোচকদের একাংশের দাবি, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় বহু সিন্ডিকেট সদস্য এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ফলে সিন্ডিকেটের মূল কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

শিল্পমহলের আশা ও সতর্কতা
রাজ্য সরকারের এক প্রবীণ মন্ত্রীর মতে, বিনিয়োগ টানতে হলে প্রথমেই সিন্ডিকেট ও তোলাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং তোলাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে।

রিয়েল এস্টেট শিল্পের প্রতিনিধিদেরও বক্তব্য, পুলিশের মনোভাবে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে অভিযোগকারীদের আপসের পরামর্শ দেওয়া হতো, এখন তোলা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তবে শিল্পমহল এখনও সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, পুরনো সিন্ডিকেট চক্র যদি শুধু রাজনৈতিক রং বদলে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতির প্রকৃত পরিবর্তন হবে না। তাই অনেক বিনিয়োগকারী এখনও অপেক্ষা করছেন, পরিবর্তন কতটা স্থায়ী এবং বাস্তব, তা দেখার জন্য।
 

 

POST A COMMENT
Advertisement