বন্দে মাতরমজাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের জন্য 'বন্দে মাতরম' গান গাওয়া কি বাধ্যতামূলক? এই প্রশ্নে দায়ের হয়েছে জনস্বার্থ মামলা হয়েছে (পিআইএল) কলকাতা হাইকোর্টে। সেই মামলাতেই হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান জানতে চেয়ে হলফনামা তলব করল। এই মামলার পরবর্তী শুনানি ১৬ সেপ্টেম্বর। তার আগেই কেন্দ্রকে আদালতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট হবে।
আসলে সম্প্রতি রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেই নোটিফিকেশনে জানান হয়, রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসাতেও 'বন্দে মাতরম' গাওয়া বাধ্যতামূলক। এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সমাজকর্মী সৌরভ দত্ত কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন।
মামলার শুনানিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তাপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ কেন্দ্রকে তাদের অবস্থান জানাতে বলে। তবে আপাতত কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি আদালত।
শুনানিতে আবেদনকারীর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, 'বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমে একটি পত্রিকার জন্য বন্দে মাতরম-এর দুটি স্তবক লিখেছিলেন। পরে আনন্দমঠ উপন্যাসে আরও কয়েকটি স্তবক যোগ হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়।' তাঁর দাবি, কেউ স্বেচ্ছায় এই গান গাইতেই পারেন। কিন্তু কাউকে জোর করে গাওয়ানো যায় না। এতে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
এ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, 'আপনারা আদালতের কাছে কী চাইছেন? আদালত কী ধরনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে পারে? আপনি একজন সমাজকর্মী—ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন? কেন্দ্রের হলফনামা ছাড়া কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়।'
এর জবাবে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য দাবি করেন, অন্তত ততদিন পর্যন্ত এই নির্দেশ কার্যকর না করার নির্দেশ দেওয়া হোক।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় দফার মামলার পর রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছিল, সব মাদ্রাসায় সকালের প্রার্থনার সময় 'বন্দে মাতরম' গাইতে হবে।
শুনানির সময় বিচারপতি বলেন, 'হাজার হাজার খ্রিস্টান পরিচালিত স্কুলেও প্রার্থনার সময় এই গান গাওয়া হয়। তাতে কি আকাশ ভেঙে পড়েছে?'
এর উত্তরে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, 'এতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। অনেক রক্তক্ষয়ের পর দেশ স্বাধীন হয়েছে।'
বিচারপতি জানান, এই মুহূর্তে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। যদি এই নির্দেশের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, 'যদি কাউকে জেলে পাঠানো হয়, তাহলে কি তিনি জেলে যাওয়ার পরই আদালতে শুনানি হবে?'
কেন্দ্রের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ ত্রিবেদী বলেন, 'এটি প্রকৃত জনস্বার্থ মামলা নয়, বরং প্রচারের উদ্দেশ্যে করা মামলা। সুপ্রিম কোর্ট আগেই বলেছে, এ ধরনের পিআইএল গ্রহণ করা উচিত নয়। কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সরকারি নীতি বদলানো যায় না।'
তিনি আরও বলেন, 'ছোটবেলায় আমার মা আমাকে যিশু খ্রিস্টের সামনে মাথা নত করতে বলতেন। তাঁকে কৃষ্ণরূপে দেখতেন। এতে ভুল কোথায়? আদর্শগত বিতর্কের ভিত্তিতে জনস্বার্থ মামলা হতে পারে না।'
ধীরজ ত্রিবেদীর দাবি, কেন্দ্রের তরফে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু 'বন্দে মাতরম' গানকে জনপ্রিয় করা। কাউকে জোর করে গান গাইতে বাধ্য করার কথা সেখানে বলা হয়নি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য কেন্দ্র সময় চায়।
এ দিন আদালতে উপস্থিত আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'এই বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছিল। একজনও মুসলিম সাংসদ এর সমর্থন করেননি। এটি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সার্বভৌম চরিত্রকে দুর্বল করবে। দশ বছরের একটি শিশু কীভাবে বলবে, 'না, আমি এই গান গাইব না?'