কলকাতা পুরভোট ও বিজেপিযে রাজ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা, সেই রাজ্যে কোনও ভোট হলে মুসলিম ফ্যাক্টর স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে। যদিও সম্প্রতি নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন, সব অঙ্কেই জল ঢেলে দিয়েছে। বিশেষ করে রেজিনগর, যেখানে ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোট, সেখানে বিপুল জয় পেয়েছে বিজেপি। কিন্তু বিধানসভার সঙ্গে পুরভোটের বেসিক পার্থক্য রয়েছে। পুরভোট একেবারে স্থানীয় সমস্যাগুলির প্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। এলাকাভিত্তিক। তা সত্ত্বেও কলকাতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরভোটেও মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ফ্যাক্টর হয়েছে অতীতে।
২০২১ সালে ৯ জন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি
তাত্পর্যপূর্ণ ভাবে কলকাতার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওয়ার্ডে মুসলিম প্রার্থীই জয়লাভ করেছেন। এবং ওই সব ওয়ার্ডগুলিতে তত্কালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী দল বিজেপি-ও মুসলিম প্রার্থীই দিয়েছিল। ২০২১ সালের কলকাতার পুরভোটের প্রার্থী তালিকার চিত্রটি অন্তত তেমনই। সে বার কলকাতা পুরভোটে কম বেশি ৯ জন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি। যেমন বেলেঘাটা ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে মহম্মদ মুক্তার, জোড়াসাঁকোতে ৩৯ নম্বর ওয়র্ডে মহম্মদ জাহাঙ্গির, চৌরঙ্গিতে ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে সাহিনা খাতুন, কলকাতা পোর্ট এলাকায় ৮০ নম্ব ওয়ার্ডে এরশাদ আহমেদ, কলকাতা পোর্ট এলাকার ১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে মমতাজ আলি, মেটিয়াবুরুজে ১৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে জনিতা নাজমিন, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ মৌসুমি, ১৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে মহিজাবিন খাতুন ও ১৪০ নম্বর ওয়ার্ডে মহম্মদ সালাউদ্দিন।
এখন প্রশ্ন হল, এ বারে কলকাতার পুরভোটে কি মুসলিম প্রার্থী দেবে বিজেপি? ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে একটি মুসলিম প্রার্থী দেখা যায়নি বিজেপি-র প্রার্থী তালিকায়। তা সত্ত্বেও দেখা গিয়েছে, রাজ্যের মুসলিম ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি জিতেছে। সম্প্রতি রেজিনগরে উপনির্বাচনে তো বিপুল ভোটে জয়ী হলেন বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার। রেজিনগরে বিজেপি-র জয় দেখিয়ে দিয়েছে, মুসলিম ভোটও বিজেপির বাক্সে যাচ্ছে।
কলকাতা পুরসভাতেও কি একই ট্রেন্ড বজায় থাকবে?
বাম আমলে গোটা রাজ্যের মতো কলকাতা পুরসভাতেও বামেদের দাপট ছিল। মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক বামেদের দিকেই ছিল। বামেরা ক্ষমতায় থাকাকালীনই পুরভোটে জয়ী হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১০ সালে বিপুল ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। ঠিক তার পরের বছরেই ছিল বিধানসভা নির্বাচন। সে বার কলকাতা পুরসভার ১৪১টি আসনের মধ্যে ৯৫টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। ২০১১ সালে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসতে চলেছে, তার সবচেয়ে জোরাল ইঙ্গিত মিলেছিল ওই নির্বাচনে। পরের কলকাতা পুরভোটগুলিতেও তৃণমূল কংগ্রেস একছত্র ভাবে জয়ী হয়। মেয়র হন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীই।
২০২৬ সাল কিন্তু ২০১১ সালের মতোই পরিবর্তনের বছর। পালাবদলের বছর। বিধানসভা ভোটে যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, কলকাতা পুরভোটেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সাধারণত কলকাতা পুরভোটের ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, শাসকদলের অধীনেই থাকে ছোট লালবাড়ি। তাই কলকাতা পুরসভার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে ২০২১ সালের মতো হয়তো মুসলিম প্রার্থী দেওয়ার পথে হাঁটবে না বিজেপি।
তা হলে মুসলিম ভোট পেতে কী স্ট্র্যাটেজি বিজেপি-র?
বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই কলকাতা পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মুসলিম ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা জোরদার করা শুরু করে বিজেপি। যে সব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দলের জনভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল, সেই সব এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জন এখন বিজেপির অন্যতম লক্ষ্য। উন্নয়নকে হাতিয়ার করে মুসলিম ভোটারদের কাছে টানতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার জাকারিয়া স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের উদ্দেশে বিজেপিকে সমর্থনের আবেদন জানান দলের নেতারা। উপস্থিত ছিলেন তাপস রায়, জোড়াসাঁকোর বিধায়ক বিজয় ওঝা এবং বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়নের প্রসঙ্গ। বিজেপির দাবি, দলের প্রার্থীদের সমর্থন করলে উন্নয়নের কাজে সংখ্যালঘুদেরও অংশীদার করা হবে।
সন্তোষ পাঠক দাবি করেন, কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০২টিতে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে। তবে মুসলিম ভোটাররা বিজেপিকে সমর্থন করলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে তিনি বার্তা দেন। বিজয় ওঝাও ভোটারদের বিজেপিকে একবার সুযোগ দিয়ে দলের কাজের ভিত্তিতে বিচার করার আবেদন জানান।
কলকাতার প্রায় ৪০টি ওয়ার্ডে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, নারকেলডাঙা, রিপন স্ট্রিট, পার্ক সার্কাস, তিলজলা, গার্ডেনরিচ ও মেটিয়াবুরুজের মতো এলাকায় সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।