লাবড়া কালীপুজো মানেই বাড়িতে পুজোর আয়োজন, প্রদীপের আলো, মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় আর ভোগের বিশেষ আয়োজন। পুজোর ভোগে খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি থেকে শুরু করে নানা পদ থাকে। তার মধ্যে লাবড়ার স্বাদই আলাদা। একাধিক মরশুমি সবজি, পাঁচফোড়ন, আদা এবং সামান্য মশলার মিশেলে তৈরি এই নিরামিষ পদটি খিচুড়ির সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়। অনেক বাড়িতেই কালীপুজোর দিন ভোগ হিসেবে লাবড়া রান্না করা হয়। তবে মন্দির বা পুজোর বাড়ির মতো স্বাদ পেতে হলে রান্নার কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। খুব বেশি মশলা না দিয়েও কীভাবে সুস্বাদু লাবড়া বানাবেন, রইল সহজ পদ্ধতি।
লাবড়া বানাতে কী কী উপকরণ লাগবে?
লাবড়ার বিশেষত্ব হল, এতে একাধিক সবজি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। বাড়িতে যে মরশুমি সবজি রয়েছে, তা দিয়েই এই পদ তৈরি করতে পারেন। তবে ভোগের লাবড়ায় সাধারণত নিরামিষ উপকরণ ব্যবহার করা হয়। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই এই রান্না করা যায়।
কুমড়ো – ২০০ গ্রাম, মিষ্টি আলু – ১টি মাঝারি, আলু – ২টি, বেগুন – ১টি, বাঁধাকপি – ২০০ গ্রাম, মুলো – ১টি ছোট, বরবটি – ৮-১০টি, পটল – ৩-৪টি, কাঁচা লঙ্কা – ৩-৪টি, আদা বাটা – ১ চা চামচ, পাঁচফোড়ন – ১ চা চামচ, শুকনো লঙ্কা – ২টি, তেজপাতা – ২টি, হলুদ গুঁড়ো – আধ চা চামচ, জিরে গুঁড়ো – আধ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো – আধ চা চামচ, নুন – স্বাদমতো, চিনি – সামান্য, সর্ষের তেল – ৩-৪ টেবিল চামচ, ঘি – ১ চা চামচ, ভাজা জিরে গুঁড়ো – আধ চা চামচ।
কীভাবে তৈরি করবেন কালীপুজোর ভোগের লাবড়া?
প্রথম ধাপ: সবজি কেটে ধুয়ে নিন
প্রথমে সব সবজি ভাল করে ধুয়ে নিন। কুমড়ো, আলু, মিষ্টি আলু, বেগুন, মুলো এবং পটল মাঝারি আকারের টুকরো করে কাটুন। বরবটি ছোট ছোট করে কেটে নিন। বাঁধাকপি একটু বড় করে কুচিয়ে রাখুন। লাবড়ার সবজি খুব ছোট করে কাটবেন না। রান্নার সময় সবজি গলে একাকার হয়ে গেলেও প্রতিটি সবজির স্বাদ যেন আলাদা করে বোঝা যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় ধাপ: সবজি হালকা ভেজে নিন
কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে প্রথমে আলু, মিষ্টি আলু এবং মুলো হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। এর পর বেগুন ও পটল অল্প ভেজে নিন। সবজি বেশি লাল করে ভাজার প্রয়োজন নেই। হালকা ভেজে নিলে রান্নার সময় সবজির স্বাদ ভাল থাকে এবং লাবড়ার গঠনও সুন্দর হয়।
তৃতীয় ধাপ: ফোড়ন তৈরি করুন
এ বার কড়াইয়ে সামান্য তেল রেখে তাতে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা এবং পাঁচফোড়ন দিন। পাঁচফোড়ন থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোতে শুরু করলে আদা বাটা দিয়ে অল্পক্ষণ নাড়ুন। এর পর হলুদ গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো এবং ধনে গুঁড়ো দিয়ে সামান্য জল ছিটিয়ে মশলাগুলি কষিয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন, মশলা যেন পুড়ে না যায়।
চতুর্থ ধাপ: একে একে সবজি দিয়ে রান্না করুন
প্রথমে কড়াইয়ে ভাজা আলু, মিষ্টি আলু ও মুলো দিয়ে মশলার সঙ্গে ভাল করে মিশিয়ে নিন। এর পর কুমড়ো, বরবটি, পটল, বেগুন এবং বাঁধাকপি দিয়ে দিন। সবজি নাড়াচাড়া করে স্বাদমতো নুন ও সামান্য চিনি মেশান। কাঁচা লঙ্কাও দিয়ে দিন। সবজিগুলি থেকে জল বেরোতে শুরু করলে ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না করুন।
পঞ্চম ধাপ: লাবড়ার স্বাদ তৈরি করুন
সবজি সেদ্ধ হতে শুরু করলে প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য গরম জল দিন। তবে একসঙ্গে বেশি জল দেবেন না। লাবড়া খুব পাতলা হবে না, আবার একেবারে শুকনোও থাকবে না। সবজি সেদ্ধ হয়ে এলে খুন্তি দিয়ে কয়েকটি সবজি হালকা চটকে দিন। এতে লাবড়ার ঝোল ঘন হবে এবং সবজির স্বাদ একসঙ্গে মিশে যাবে। তবে সব সবজি চটকে ফেলবেন না।
ষষ্ঠ ধাপ: শেষ মুহূর্তে ঘি ও ভাজা মশলা
সবজি পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে গেলে উপর থেকে সামান্য ঘি এবং ভাজা জিরে গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। আরও একবার ভাল করে মিশিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিন। চাইলে এক চিমটি গরম মশলা গুঁড়োও দিতে পারেন। তবে ভোগের লাবড়ায় মশলার গন্ধ বেশি হওয়া উচিত নয়। পাঁচফোড়ন, আদা এবং সবজির নিজস্ব স্বাদই এই রান্নার আসল বৈশিষ্ট্য।
ভোগের লাবড়া সুস্বাদু করতে কয়েকটি টিপস
লাবড়া রান্নার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখলে স্বাদ অনেকটাই বেড়ে যায়। প্রথমত, সবজি খুব ছোট করে কাটবেন না। দ্বিতীয়ত, সবজি বেশি ভাজবেন না। এতে লাবড়ার স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হতে পারে। তৃতীয়ত, রান্নায় পেঁয়াজ-রসুন ব্যবহার করবেন না। ভোগের নিরামিষ স্বাদ বজায় রাখতে সর্ষের তেল, আদা, পাঁচফোড়ন এবং ঘি ব্যবহার করুন। কুমড়ো ও মিষ্টি আলু লাবড়ায় স্বাভাবিক মিষ্টি স্বাদ এনে দেয়। তাই চিনি খুব বেশি দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এ ছাড়া রান্নার সময় সবজি একসঙ্গে না দিয়ে শক্ত সবজি আগে এবং নরম সবজি পরে দিলে সবকিছু সমানভাবে সেদ্ধ হবে। কুমড়ো ও বেগুন বেশি আগে দিলে গলে যেতে পারে। তাই রান্নার শেষের দিকে সেগুলি দেওয়া ভাল।
কালীপুজোর দিন গরম খিচুড়ি, লাবড়া এবং চাটনির সঙ্গে ভোগ পরিবেশন করলে জমে যাবে আয়োজন। খুব বেশি উপকরণ বা জটিল মশলার প্রয়োজন নেই। বাড়িতে থাকা কয়েকটি মরশুমি সবজি দিয়েই সহজে তৈরি করে ফেলতে পারবেন পুজোর বিশেষ ভোগের লাবড়া।