কাতলা কালিয়ামোগলাই রান্নার দুটি মূল স্তম্ভ হল কোর্মা এবং কালিয়া। কোর্মা মূলত ঘি-নির্ভর একটি পদ, যেখানে জল ব্যবহার করলেও তা রান্নার শেষে সম্পূর্ণ শুকিয়ে ফেলা হয়। অন্যদিকে, কালিয়া তৈরি হয় জল বা দুধের উপর ভিত্তি করে, তাই এর গ্রেভি বা ঝোল তুলনামূলকভাবে একটু পাতলা বা রসা গোছের হয়। কোর্মা যেখানে বিশেষ উৎসব বা অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ, কালিয়া সেখানে রোজকার আয়োজনের অঙ্গ।
অবশ্য আমাদের পরিচিত এই বাঙালি কালিয়া, আদতে মোগলদের তৈরি কালিয়ার থেকে বেশ কিছুটা আলাদা। মোগলাই কালিয়া এতটা ঝাল হত না। বাংলার নবাবদের হাত ধরে স্থানীয় স্বাদ এবং মশলার মেলবন্ধনে এই পদ আরও একটু ঝাল এবং মশলাদার হয়ে উঠেছে।
পাকা রুই বা কাতলার (অন্তত ৩ কেজি বা তার বেশি ওজনের) কালিয়া বাঙালির এক পরম তৃপ্তির জায়গা। বাজার থেকে সদ্য কিনে আনা জ্যান্ত তিন-চার কেজির কাতলা একই দিনে রাঁধতে পারলে তো আর কথাই নেই! আমাদের এই রেসিপিতে ঝালের পরিমাণ একটু বেশি থাকলেও, টক দই আর টমেটোর টক ভাব এবং ভাজা পেঁয়াজ (বেরেস্তা), চিনি ও কিশমিশের মিষ্টি স্বাদ তাকে দারুণভাবে ব্যালেন্স করে। আপনি চাইলে এই গ্রেভিতে ভেজে রাখা আলুও যোগ করতে পারেন। গরম সাদা ভাত বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করার জন্য এর চেয়ে নিখুঁত পদ আর কী বা হতে পারে!
উপকরণ (৬ জনের জন্য)
মাছ ও ম্যারিনেশন
কাতলা মাছ: ৬০০ গ্রাম (পেটি ও গাদা)
লবণ: ৮ গ্রাম
হলুদ গুঁড়ো: ৩ গ্রাম
মূল রান্নার জন্য
সর্ষের তেল: ৮০ গ্রাম
ঘি: ১০ গ্রাম
শুকনো লঙ্কা: ৪টি
তেজপাতা: ৪টি
ছোট এলাচ: ৪টি
লবঙ্গ: ৪টি
দারচিনি: ২ টুকরো
গোটা জিরে: ১ চা-চামচ
পেঁয়াজ বাটা: ১৫০ গ্রাম
কুচিয়ে নেওয়া পেঁয়াজ: ১০০ গ্রাম (বেরেস্তার জন্য)
আদা: ২০ গ্রাম
টমেটো: ৩০ গ্রাম
টক দই: ৫০ গ্রাম
হলুদ গুঁড়ো: ৬ গ্রাম
লঙ্কা গুঁড়ো: ২ গ্রাম
কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো: ৬ গ্রাম
জিরে গুঁড়ো: ৪ গ্রাম
কিশমিশ: ৩০ গ্রাম
লবণ: ২৭ গ্রাম
চিনি: ৩৫ গ্রাম
গরম জল: ৫০০ গ্রাম
বাঙালি গরম মশলা গুঁড়ো: ১/২ চা-চামচ
কাঁচা লঙ্কা: ৬টি
প্রণালী
প্রাথমিক প্রস্তুতি ও ম্যারিনেশন
রান্নার শুরুতে প্রথমেই নজর দিন মাছের দিকে। মাছের টুকরোগুলো ভাল করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নেওয়া জরুরি, খেয়াল রাখবেন গায়ে যেন একটুও স্যাঁতস্যাঁতে ভাব না থাকে। এরপর তাতে পরিমাণ মতো লবণ ও সামান্য হলুদ গুঁড়ো মাখিয়ে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখুন। গরমের দিন হলে ম্যারিনেট করা মাছটি নিশ্চিন্তে ফ্রিজে তুলে রাখতে পারেন। রান্নার অন্যান্য প্রস্তুতির জন্য ১০০ গ্রাম পেঁয়াজ লম্বালম্বি মিহি করে কুচিয়ে নিন, যা পরে বেরেস্তা তৈরিতে কাজে লাগবে। বাকি ১৫০ গ্রাম পেঁয়াজ ডুমো করে কেটে মিক্সার গ্রাইন্ডারে খোসা ছাড়ানো আদার সঙ্গে মিশিয়ে জল ছাড়াই একটি মিহি পেস্ট তৈরি করে নিন। পাশাপাশি টমেটোগুলো ছোট টুকরো করে কেটে এবং কাঁচা লঙ্কাগুলো লম্বালম্বি চিরে প্রস্তুত রাখুন। অন্য একটি পাত্রে টক দই ভাল করে ফেটিয়ে নিন যাতে কোনও ডেলা না থাকে এবং গুঁড়ো মশলাগুলো— হলুদ, জিরে, লাল লঙ্কা ও কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো একসঙ্গে মেপে হাতের কাছেই রাখুন।
বেরেস্তা ও মাছ ভাজা
এবার কড়াই বা উনুন বেশ কড়া আঁচে গরম করে সর্ষের তেল ঢেলে দিন। তেল থেকে ধোঁয়া উঠলে আঁচ কমিয়ে তেলের তাপমাত্রা সামান্য নামতে দিন। এই তেলেই কুচিয়ে রাখা পেঁয়াজগুলো ছেড়ে ধৈর্য ধরে হালকা বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। মোটামুটি মিনিট ছয়েক ভাজার পর যখন সুন্দর রং ধরবে, সঙ্গে সঙ্গে তেল থেকে ছেঁকে তুলে নিন। নিজস্ব তাপমাত্রায় পেঁয়াজের রং এমনিতেই আরও কিছুটা গাঢ় হয়ে যায়, তাই কড়া করে ভাজলে বেরেস্তা তেতো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এরপর ওই একই তেলে ম্যারিনেট করা মাছের টুকরোগুলো বেশ লালচে করে ভেজে তুলে রাখুন। পেটি ও গাদার টুকরো আলাদাভাবে ভাজাই ভাল। কালিয়ার ক্ষেত্রে মাছ একটু কড়া করে ভাজতে হয়। মাছ ভাজার এই তেলেই পুরো কালিয়াটা রান্না হবে, যাতে মাছের আসল ফ্লেভার গ্রেভিতে সুন্দরভাবে মিশে যায়।
মশলা কষানো ও গ্রেভি তৈরি
মাছ ভাজার পর অবশিষ্ট তেলে সামান্য ঘি গলিয়ে নিয়ে আঁচ কমিয়ে দিন। এবার একে একে শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা, গোটা গরম মশলা (এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি) ও গোটা জিরে ফোড়ন দিন। মশলার সুবাস ছড়িয়ে পড়লে আগে থেকে তৈরি করে রাখা পেঁয়াজ ও আদার পেস্ট কড়াইতে দিয়ে দিন। মশলার কাঁচা ভাব কাটিয়ে রং গাঢ় হওয়া পর্যন্ত খুব ভালোভাবে কষাতে থাকুন। এরপর মিশিয়ে রাখা গুঁড়ো মশলাগুলো দিয়ে দিন। মশলা যাতে কড়াইতে লেগে পুড়ে না যায়, তার জন্য মাঝে মাঝে দু-এক চামচ গরম জলের ছিটে দিতে পারেন। মিনিট ছয়েক কষানোর পর স্বাদমতো লবণ, চিনি এবং টুকরো করা টমেটো দিয়ে কড়াই ঢেকে দিন। টমেটো নরম হয়ে গলে যাওয়া পর্যন্ত এইভাবেই রান্না করুন, প্রয়োজনে একটু-একটু করে গরম জল দিতে পারেন।
চূড়ান্ত পর্ব ও পরিবেশন
মশলা ভালোভাবে মজে গেলে কড়াইয়ের আঁচ বাড়িয়ে ফেটিয়ে রাখা টক দই দিয়ে একটানা নাড়তে থাকুন, যাতে দই কোনও ভাবেই ফেটে না যায়। মশলা থেকে তেল বা রোগান আলাদা হয়ে উপরে ভেসে উঠলে কিশমিশগুলো ছড়িয়ে দিন। পুরো মশলাটা একেবারে নিখুঁতভাবে কষানো হয়ে গেলে তাতে আধ লিটার ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিন। ঝোল টগবগ করে ফুটে উঠলে খুব সাবধানে ভেজে রাখা মাছের টুকরো, চেরা কাঁচা লঙ্কা এবং আগে থেকে তৈরি করা বেরেস্তা ছড়িয়ে দিন। কালিয়ার মনমতো টেক্সচার বা ঘনত্ব না আসা পর্যন্ত মাঝারি আঁচে ঝোল ফোটাতে থাকুন। তবে খেয়াল রাখবেন গ্রেভি যেন অতিরিক্ত ঘন না হয়ে যায়, কারণ ঠান্ডা হওয়ার পর মাছ অনেকটা ঝোল টেনে নিয়ে গ্রেভি এমনিতেই আরও মাখোমাখো করে দেয়। সবশেষে গ্যাস বন্ধ করে উপর থেকে সুগন্ধি বাঙালি গরম মশলা গুঁড়ো ছড়িয়ে একটি আঁটসাঁট ঢাকনা দিয়ে কড়াই ঢেকে দিন। পরিবেশন করার আগে অন্তত আধ ঘণ্টা এইভাবেই স্ট্যান্ডিং টাইমে রেখে দিন। তারপর গরম সাদা ভাত বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন আপনার সযত্নে রাঁধা এই রাজকীয় পদ।