নারকেল নাড়ু রেসিপিপুজোর মরসুম হোক বা এমনি কোনও ছুটির দিন— বাঙালির ঘরে মিষ্টিমুখের কথায় সবার আগে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, তা হল কাঁসার থালায় সাজানো গোল গোল নারকেল নাড়ু। ছোটবেলায় দিদা-ঠাকুমাদের হেঁশেল থেকে ভেসে আসা গুড় আর নারকেল পাক দেওয়ার সেই ম ম গন্ধটা আজও যেন অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। আজকাল দোকানে-বাজারে নিখুঁত আকারের নাড়ু কিনতে পাওয়া গেলেও, মা-ঠাকুমাদের হাতের সেই জাদু যেন তাতে বড্ড মিসিং!
আসল ম্যাজিক লুকিয়ে থাকে দামি উপকরণে নয়, বরং ধৈর্য আর পাক দেওয়ার সঠিক কায়দায়। কীভাবে নিজের হেঁশেলেই ফিরিয়ে আনবেন সেই পুরনো দিনের স্বাদ? রইল তারই হদিস।
উপকরণ:
কোরানো নারকেল: ২ কাপ (মাঝারি মাপের ২টি নারকেল)
আখের বা খেজুরের গুড়: দেড় কাপ (গুড় ভেঙে ছোট টুকরো বা গুঁড়ো করে নেওয়া)
ছোট এলাচ গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ
ঘি: ১ চা চামচ (হাতে মাখানোর জন্য)
দুধ: ২ টেবিল চামচ (নাড়ুর স্বাদ ও বাঁধন মজবুত করতে, তবে এটি ঐচ্ছিক)
সামান্য কর্পূর: এক চিমটে (একেবারে সাবেকি গন্ধ চাইলে ব্যবহার করতে পারেন)
প্রণালী:
১. নারকেল কোরানোর কায়দা: মা-ঠাকুমাদের প্রথম গোপন সূত্র হল নারকেল কোরানো। খেয়াল রাখবেন, নারকেল কোরানোর সময় যেন মালার দিকের বাদামি বা কালো অংশটি একেবারেই না ওঠে। শুধু ওপরের সাদা অংশটি দিয়ে নাড়ু করলে তা দেখতে ও খেতে, দুই-ই চমৎকার হয়।
২. আগে থেকে মেখে রাখা: সরাসরি কড়াইতে না চাপিয়ে, একটি বড় পাত্রে কোরানো নারকেল এবং গুড় একসঙ্গে নিয়ে হাত দিয়ে খুব ভালো করে চটকে মেখে নিন। এই মাখার পর্বটি যত ভালো হবে, নাড়ুর পাক তত মসৃণ হবে। মিশ্রণটি অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট এভাবেই ঢেকে রেখে দিন। এতে গুড় গলে নারকেলের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যাবে।
৩. সঠিক আঁচে পাক দেওয়া: এবার একটি মোটা তল যুক্ত কড়াই (লোহার বা পিতলের কড়াই হলে সবচেয়ে ভালো, নাহলে নন-স্টিক বা ভারী অ্যালুমিনিয়াম) মাঝারি আঁচে বসান। কড়াই হালকা গরম হলে নারকেল ও গুড়ের মিশ্রণটি ঢেলে দিন। পুরো রান্নাটাই করতে হবে মাঝারি থেকে কম আঁচে।
৪. অনবরত নাড়া: নাড়ু তৈরির মূল শর্ত হল ধৈর্য। অনবরত খুন্তি নেড়ে যেতে হবে কড়াইয়ের তলা থেকে। একটু অন্যমনস্ক হলেই তলায় লেগে গিয়ে স্বাদ তেতো হয়ে যেতে পারে।
৫. টেক্সচার ও স্বাদ বৃদ্ধি: মিনিট পনেরো পর দেখবেন মিশ্রণটি বেশ আঠালো হতে শুরু করেছে এবং রং কালচে হয়ে আসছে। এই সময়ে চাইলে সামান্য দুধ ছড়িয়ে দিতে পারেন, এতে নাড়ুর টেক্সচার খুব নরম হয় এবং সহজে শুকিয়ে যায় না। একেবারে শেষে এক চিমটে কর্পূর ও এলাচ গুঁড়ো ছড়িয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন।
৬. পাক চেনার উপায়: পাক ঠিকমতো এল কি না, বুঝবেন কী করে? খুন্তি দিয়ে নাড়ার সময় যখন দেখবেন মিশ্রণটি কড়াইতে আর ছড়িয়ে থাকছে না, বরং গা ছেড়ে একজোট হয়ে দলা পাকিয়ে আসছে— তখন বুঝবেন পাক প্রায় শেষ। নিশ্চিত হতে অল্প একটু অংশ আঙুলে নিয়ে গোল করে দেখুন। যদি দেখেন সহজেই সুন্দর গোল আকার নিচ্ছে এবং আঙুলে জড়াচ্ছে না, তবে পাক একেবারে তৈরি। গ্যাস বন্ধ করে দিন।
৭. গরম থাকতে থাকতেই গোল করা: মিশ্রণটি একটি ছড়ানো থালায় নামিয়ে নিন। খুব ঠান্ডা হয়ে গেলে কিন্তু নাড়ু গোল করা যাবে না, ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে যাবে। তাই হাতে সামান্য ঘি মাখিয়ে, মিশ্রণটি গরম থাকতে থাকতেই (যাতে হাতের তালু ওই গরম সহ্য করতে পারে) দ্রুত ছোট ছোট গোল আকার দিয়ে নিন। বাড়িতে অন্য কেউ থাকলে এই কাজে হাত লাগাতে বলতে পারেন, তাহলে মিশ্রণ ঠান্ডা হওয়ার আগেই সব নাড়ু তৈরি হয়ে যাবে।
ব্যস, কিছুক্ষণ খোলা হাওয়ায় রেখে ঠান্ডা হতে দিন। পুরোপুরি ঠান্ডা হলে একটি পরিষ্কার কাচের বয়ামে ভরে রাখুন। একটা মুখে পুরলেই বুঝবেন, মা-ঠাকুমাদের সেই আদরের স্বাদ আবার ফিরে এসেছে আপনারই হাতের মুঠোয়।