পান্তা ভাতচৈত্রের শেষ হোক বা বৈশাখের কাঠফাটা রোদ— বাংলার গ্রীষ্মকাল মানেই প্যাঁচপেঁচে গরম আর হাঁসফাঁস অবস্থা। আর এই প্রবল গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে পান্তা ভাতের চেয়ে উপাদেয় এবং পুষ্টিকর আর কী বা হতে পারে!
শতাব্দী প্রাচীন এই পদটি মূলত আগের দিনের রান্না করা ভাত সারারাত জলে ভিজিয়ে গাঁজিয়ে তৈরি করা হয়। গরমের দিনে এক থালা পান্তা ভাত শুধু যে পেট ঠান্ডা রাখে তা নয়, শরীরে প্রচুর পরিমাণে প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জোগান দেয়, যা হজমশক্তি বাড়াতে দারুণ কার্যকরী। উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে ভাতের কার্বোহাইড্রেট গাঁজানোর ফলে, এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও খনিজ পদার্থের পরিমাণ এবং কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। আর পান্তা খাওয়ার পর দুপুরে যে গাঢ় ঘুমটা আসে— সেই আরামদায়ক 'ভাত-ঘুম' তো বাঙালির চিরকালীন নস্টালজিয়া!
সঠিক পদ্ধতিতে পান্তা ভাত তৈরির রেসিপি
প্রাথমিক প্রস্তুতি:
প্রথমে চাল ভাল করে ধুয়ে হাঁড়িতে জল দিন।
আলুর খোসা ছাড়িয়ে বড় বড় টুকরো করে ভাতের সঙ্গেই ফুটতে দিন।
সাধারণত ভাত রান্না করতে আপনার যতটা সময় লাগে, এক্ষেত্রে তার চেয়ে অন্তত ১০ মিনিট বেশি সময় ধরে চাল ফোটান। মনে রাখবেন, ভাত যত নরম হবে, পান্তার স্বাদ তত খুলবে।
ভাত হয়ে গেলে সেদ্ধ আলুগুলো সাবধানে তুলে নিয়ে ভাতের ফ্যান ঝরিয়ে নিন। এরপর স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ভাতটাকে পুরোপুরি ঠান্ডা হতে দিন।
গাঁজানোর প্রক্রিয়া
ভাত পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে গেলে তাতে সাধারণ জল ঢালুন। খেয়াল রাখবেন, জলের স্তর যেন ভাতের অন্তত ২ সেন্টিমিটার উপরে থাকে।
হাতের সাহায্যে ভাতের দলাগুলো আলতো করে ভেঙে দিন।
এবার একটি ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায় হাঁড়িটি ঢেকে অন্তত ৮ ঘণ্টার জন্য রেখে দিন।
পরিবেশনের কায়দা
পান্তা ভাতের আসল মজা লুকিয়ে আছে তার মাখায় আর সাজানোয়।
প্রথমে ভাত থেকে জলটা একটু নিংড়ে একটি বড় বাটিতে তুলে নিন। এবার ওই সেদ্ধ আলুর সঙ্গে ভাতটা খুব ভাল করে চটকে মেখে নিন।
কড়াইতে শুকনো লঙ্কা ভেজে নিন। আর হামানদিস্তায় কয়েকটি কাঁচালঙ্কা থেঁতো করে নিন।
এবার ভাতের মধ্যে পরিমাণ মতো নুন, বেশ কিছুটা কাসুন্দি এবং কয়েক ফোঁটা গন্ধরাজ লেবুর রস দিন। থেঁতো করা কাঁচালঙ্কা দিয়ে সব উপকরণ একসঙ্গে খুব ভালো করে মিশিয়ে নিন।
এই মিশ্রণে এক হাতা ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা টক ডাল (আম ডাল হলে সবচেয়ে ভাল) এবং স্লাইস করে কাটা পেঁয়াজ দিয়ে আলতো হাতে আবার মাখুন।
এবার ভাতের সেই ভিজিয়ে রাখা জলটা (পান্তার জল) উপর থেকে এক হাতা ঢেলে দিন।
সবশেষে তাজা নারকেল কুচি, কাঁচালঙ্কা, ভাজা শুকনো লঙ্কা, পেঁয়াজের টুকরো এবং ডালের মধ্যে থাকা এক টুকরো আম দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন জিভে জল আনা পান্তা।
কীসের সঙ্গে খাবেন?
পান্তার সঙ্গে যদি থাকে গরম গরম আলু-পেঁয়াজ ভাজা, আলু ভর্তা, মুচমুচে ডালের বড়া কিংবা কড়কড়ে মাছ ভাজা— তবে গরমের দুপুরের এই রাজকীয় ভোজের কাছে অনায়াসেই হার মানবে যে কোনও রেস্তরাঁর মেনু!