গরমে কুল থাকার পানীয়Summer Drinks For Office Workers: বাইরে গনগনে রোদ আর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মারাত্মক পারদ। অফিসের ঠান্ডা এসি-র মধ্যে বসেও যেন স্বস্তি নেই। অনেকেরই মাথা ঝিমঝিম করে, দুপুর ১টা বাজলেই দুচোখ জুড়ে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম, সেই সঙ্গে মেজাজ খিটখিটে। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে চাঙ্গা করতে আমরা সাধারণত কী করি? এক কাপের পর আরেক কাপ কড়া চা বা কফি গিলে ফেলি। কিন্তু কলকাতার বিশিষ্ট ডায়েটিশিয়ান ড. শর্মিষ্ঠা রায় এ বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। তাঁর স্পষ্ট কথা, “গরমে ঘন ঘন চা-কফি খেলে শরীরে ডিহাইড্রেশন বা জলকষ্ট আরও বাড়ে। ক্যাফেইন মূলত শরীর থেকে জল টেনে নেয়। ফলে সাময়িকভাবে একটু চাঙ্গা লাগলেও, ঠিক ১ ঘণ্টা পর শরীর আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মারাত্মক অ্যাসিডিটি দেখা দেয়।”
তাহলে এই তীব্র গরমে শরীর ও মনকে তরতাজা রাখার উপায় কী? অফিসের ডেস্কে বসেই সহজে খাওয়া যায়, এমন ৫টি জাদুকরী পানীয় রয়েছে যা শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখে, শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স ঠিক করে এবং মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ হরমোন বাড়িয়ে মুড একদম ফুরফুরে রাখে। এগুলির দাম যেমন কম, তেমনই কোনো সাইড এফেক্ট নেই।
১. ডাবের জল (প্রকৃতির ওআরএস):
ডাবের জলে রয়েছে পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ। গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে নুন বেরিয়ে যায়, ডাবের জল মাত্র ১৫ মিনিটে তা পূরণ করে মাথা ধরা বা পেশির টান (মাসল ক্র্যাম্প) কমায়। এর পটাশিয়াম স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখে। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টের মধ্যে, খালি পেটে না খেয়ে হালকা টিফিনের পর এটি খাওয়া ভালো। অফিসের নিচেই ৩০-৪০ টাকায় এটি পেয়ে যাবেন। তবে ফ্রিজের ঠান্ডা নয়, নরমাল টেম্পারেচারের ডাব খান, এতে গলা বসবে না।
২. ছাতুর শরবত (এনার্জি বুস্টার)
ছোলার ছাতু বা সত্তু হল ‘পুওর ম্যানস প্রোটিন’। এতে প্রোটিন, ফাইবার, আয়রন ও ক্যালসিয়াম ঠাসা থাকে। এটি পেট ঠান্ডা রাখে ও অ্যাসিডিটি কমায়। ১ গ্লাস খেলে অন্তত ৩ ঘণ্টা ক্ষিদে পাবে না। ২ চামচ ছাতু, ১ গ্লাস জল, বিটনুন, লেবুর রস ও ভাজা জিরে গুঁড়ো একসাথে ঝাঁকিয়ে নিন। মিষ্টি চাইলে চিনি না দিয়ে গুড় দিন। দুপুরে লাঞ্চের ৩০ মিনিট আগে এটি খেলে ভাত খাওয়ার ইচ্ছে কমবে, ফলে ‘ভাতঘুম’ আপনাকে কাবু করতে পারবে না। এটি একটি লো-জিআই (GI) ফুড হওয়ায় সুগার স্পাইক করে না, ফলে বিকেলে মাথা ঝিমঝিম করে না এবং মন শান্ত থাকে।
৩. বেলের শরবত
পাকা বেল হল গরমের আসল যম। হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া, আলসার ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো রোগের অব্যর্থ ওষুধ এটি। এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে এবং এর ভিটামিন C রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাকা বেলের শাঁস জলে গুলে ছেঁকে নিয়ে তাতে গুড় বা তালমিছরি এবং একটু বিটনুন মিশিয়ে নিন। তবে বরফ কুচি দেবেন না। বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টোর মধ্যে এটি খাওয়ার সেরা সময়। রোদ থেকে এসেই সাথে সাথে না খেয়ে ১০ মিনিট জিরিয়ে নিয়ে তবেই খান। পেট ঠান্ডা থাকলে মাথাও গরম হয় না, রাগ ও বিরক্তি কমে।
৪. পুদিনা-লেবু-গন্ধরাজ ঘোল (ডেস্কের মকটেল)
টক দই একটি দারুণ প্রোবায়োটিক, যা পেটের ‘গাট হেলথ’ বা হজমশক্তি ভালো রাখে। আর বিজ্ঞান বলে, পেট ভালো থাকলে ‘গাট-ব্রেন কানেকশন’-এর কারণে মুডও ভালো থাকে। এর সাথে পুদিনা শরীর ঠান্ডা করে এবং লেবু দেয় ভিটামিন C। ৩ চামচ টক দই, ১ গ্লাস জল, ৫টা পুদিনা পাতা, গন্ধরাজ লেবুর রস, বিটনুন ও ভাজা জিরে মিক্সিতে ঘুরিয়ে বাড়ি থেকে বোতলে করে অফিসে নিয়ে আসুন। লাঞ্চের সাথে বা বিকেল ৪টেয় চায়ের বদলে এটি খান। দইয়ের ক্যালসিয়াম ব্রেনে ‘ফিল গুড’ হরমোন রিলিজ করে টেনশন কমায়।
৫. খস-খস শরবত (পুরনো দিনের কুলার)
ভেটিভার বা খস-খসের শিকড়কে আয়ুর্বেদে অত্যন্ত ‘শীতল’ বলা হয়েছে। এটি শরীরের ভিতরের জ্বালাপোড়া, নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও ঘামাচি কমায় এবং রক্ত শুদ্ধ করে। বাজারে সহজেই ‘খস সিরাপ’ কিনতে পাওয়া যায়। ২ চামচ সিরাপ, ১ গ্লাস ঠান্ডা জল ও লেবুর রস মিশিয়ে এটি তৈরি হয়, চাইলে এতে সামান্য সাবুদানা ভিজিয়ে দিতে পারেন। যখন সবচেয়ে বেশি ক্লান্তি গ্রাস করে, সেই দুপুর ৩টের সময় এটি খান। খসের সুগন্ধ অ্যারোমাথেরাপির মতো কাজ করে স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমায় এবং রাতে ঘুম ভালো হয়।