ডেঙ্গিতে মৃত্যুনিয়মিত বৃষ্টিতে ভিজছে বাংলা। তার মধ্যেই অ্যাক্টিভ হল ডেঙ্গি। প্রাণ কেড়ে নিল ১০ বছরের এক স্কুলছাত্রের। দমদমের বাসিন্দা ওই পড়ুয়া কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। তার রক্তপরীক্ষা করা হয়। সেখানে ডেঙ্গি ধরা পড়ে। এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতির ফলে মৃত্যু হয় তার।
এখন প্রশ্ন হল, ঠিক কেন হাজার চেষ্টার পরও ডেঙ্গিতে মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না? কোথায় সমস্যা? আর সেই উত্তরটাই দিলেন বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকেরা।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: রজত বাসু বলেন, 'ডেঙ্গিকে আমরা এখনও অনেকটা মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখি। অথচ বাস্তবতা হল, পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি এখন একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। আমাদের পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। শহর বড় হচ্ছে। নির্মাণকাজ বাড়ছে। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়া বজায় থাকছে। এই সব কিছু ডেঙ্গির এডিস মশার জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে মশা শুধু বর্ষাকালেই নয়, বছরের অনেকটা সময় সক্রিয় থাকছে।'
তিনি আরও জানান, গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কলকাতা ও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার সঙ্গে ডেঙ্গির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষার ২ থেকে ৩ মাস পরে সাধারণত সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বর্তমানে অগাস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৯০ শতাংশ ডেঙ্গি রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, ডেঙ্গুতে অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। সময়মতো রোগ চিনে চিকিৎসা শুরু করা গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রোগী দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছান। যার ফলে বিপদ বাড়ে।
কেন মৃত্যু আটকানো যাচ্ছে না?
এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: রুদ্রজিৎ পাল বলেন, 'ডেঙ্গি ইনফেকশনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটা খুব খারাপ জটিলতা তৈরি হয়। যেটাকে আমরা বলি ক্যাপিলারি লিক সিন্ড্রোম। এক্ষেত্রে হঠাৎ করেই আমাদের রক্ত থেকে জলীয় অংশ বেরিয়ে যায়। এরপর রোগী শকে চলে যান। ব্লাড প্রেশার কমে গিয়ে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এটা সবার হয় না। হয়তো ১০০০ জনে একজনের হয়।'
ডা: পাল জানালেন, এই সমস্যা হলে খুব কম সময় পাওয়া যায়। খুব তাড়াতাড়ি মৃত্যুর দিকে চলে যেতে পারেন রোগী। তিনি বলেন, 'যদি ঠিক সময়ে এটা ধরা না পড়ে, তাহলে প্রায় কিছুই করার থাকে না। রোগীর মৃত্যু হয়।'
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: শিঞ্জিনী ঘোষ বলেন, 'জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শুধু তাই নয়, জ্বরের সময় অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে। এর জন্য বিপদ বাড়ে। এই সময় প্রচুর পরিমাণে ফ্লুইড খেতে হবে।'
ডা: বাসু জানালেন, আসলে অধিকাংশ ডেঙ্গু মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হল-
১. দেরিতে রোগ নির্ণয়
২. সতর্কতামূলক লক্ষণ উপেক্ষা করা
৩. শক সিনড্রোমের সময় হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করা
তাঁর মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র স্বাস্থ্য দফতরের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক, গবেষক এবং নীতিনির্ধারক, সকলের সঙ্গে নিয়ে লড়তে হবে। তাহলেই ডেঙ্গি থেকে সুরক্ষিত থাকা যাবে।
এই সব লক্ষণে সাবধান