Heatwave: হিটওয়েভ থেকে বাঁচতে খান চিনি মেশানো দুধ, আয়ুষ মন্ত্রকের পরামর্শে শোরগোল

বিপজ্জনক হয়ে উঠছে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ। ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, পেশিতে টান, মাথাব্যথা ও গ্যাস্ট্রিক সমস্যার মতো নানা শারীরিক অসুবিধা তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত গরমে। আর এই হিটওয়েভের মোকাবিলা করতে দুধে চিনি মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আয়ুষ মন্ত্রক।

Advertisement
 হিটওয়েভ থেকে বাঁচতে খান চিনি মেশানো দুধ, আয়ুষ মন্ত্রকের পরামর্শে শোরগোলহিটওয়েভ থেকে বাঁচতে চিনি দিয়ে দুধ!
হাইলাইটস
  • দুধে চিনি মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ আয়ুষ মন্ত্রকের
  • হিটওয়েভের মোকাবিলা করতে এমন পরামর্শ
  • এই নিয়ে কী বলছেন চিকিৎসকরা?

ভারতে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। আর তার সঙ্গে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ। ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, পেশিতে টান, মাথাব্যথা ও গ্যাস্ট্রিক সমস্যার মতো নানা শারীরিক অসুবিধা তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত গরমে। বিশেষ করে শিশু, মহিলা, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করেন, তাঁদের শরীরে এই হিটওয়েভ বেশি প্রভাব ফেলে।

এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি কেন্দ্রের আয়ুষ মন্ত্রক একটি জনস্বাস্থ্য পরামর্শ জারি করেছে। যেখানে তাপজনিত অসুস্থতা এড়াতে একাধিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই পরামর্শের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শোরগোল ফেলে দিয়েছে দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খাওয়ার সুপারিশ। যদিও অধিকাংশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাধারণত অতিরিক্ত চিনি খাওয়া কমানোর পরামর্শ দেন, তবুও এই মন্ত্রকের দাবি, এই সহজ পানীয়টি তীব্র গরমের সময়ে শরীরের জলীয় ভারসাম্য ও শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

এই পরামর্শ ঘিরে পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে সহজলভ্য ও ঐতিহ্যগত উপকারী উপায় হিসেবে সমর্থন করছেন। আবার কেউ সতর্ক করে বলছেন, এটি সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধ ও চিনির সংমিশ্রণ দ্রুত শক্তি এবং কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে পারে, তবে এটি কখনওই জল, ORS বা ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয়ের বিকল্প নয়।

কেন গরমে দুধের সঙ্গে চিনি উপকারী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে প্রচুর জল ও প্রয়োজনীয় খনিজ হারায়। ফলে শরীরে দুর্বলতা, ক্লান্তি ও ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

মধুকর রেইনবো চিলড্রেনস হাসপাতালের ডায়েটিশিয়ান ও ল্যাকটেশন কনসালট্যান্ট ডা. সমীক্ষা কালরা জানান, গরমের সময় দুধ ও চিনির মিশ্রণ কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তিনি বলেন, 'হিটওয়েভের সময় মহিলা ও শিশুরা বিশেষভাবে ডিহাইড্রেশন, ক্লান্তি এবং তাপজনিত দুর্বলতার শিকার হন। কারণ তাঁদের শরীর দ্রুত জল ও শক্তি হারায়। দুধ ও চিনির সংমিশ্রণ শরীরে জলীয় ভারসাম্য, দ্রুত শক্তি এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।' তাঁর ব্যাখ্যায়, দুধে জল, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও প্রোটিন থাকে, যা শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে ও শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, চিনি দ্রুত গ্লুকোজ সরবরাহ করে, যা অতিরিক্ত ঘাম ও গরমের কারণে হওয়া ক্লান্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ, 'বিশেষ করে বাইরে খেলাধুলা করা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। আর গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে ক্লান্তি কমাতে ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে।' বিশেষজ্ঞদের আরও মত, ঠান্ডা দুধ শরীরে কিছুটা আরামদায়ক ও শীতল অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

Advertisement

আয়ুর্বেদ কী বলছে?
পুষ্টিবিদ দীপ্তা নাগপালের মতে, এই পরামর্শের শিকড় রয়েছে আয়ুর্বেদে। তিনি বলেন, 'আয়ুষ মন্ত্রকের এই সুপারিশ সম্ভবত আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্য থেকেই এসেছে। আয়ুর্বেদে দুধকে ঠান্ডা খাবার হিসেবে ধরা হয়, যা শরীরের পিত্ত দোষ বা অতিরিক্ত তাপ কমাতে সাহায্য করে। এর সঙ্গে চিনি, বিশেষ করে মিশ্রি বা অপরিশোধিত চিনি মেশালে শরীর আরও ঠান্ডা থাকে এবং দ্রুত শক্তি মেলে বলে মনে করা হয়।'

আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের দিক থেকেও কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে। নাগপালের মতে, দুধে প্রায় ৮৭ শতাংশ জল থাকে। পাশাপাশি এতে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো ইলেকট্রোলাইট রয়েছে, যা ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসক আরও বলেন, 'চিনির ক্ষেত্রেও কিছু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। গ্লুকোজ অন্ত্রে সোডিয়াম ও জল শোষণে সাহায্য করে, যা SGLT-1 transporter mechanism-এর মাধ্যমে কাজ করে। ORS কাজ করার পদ্ধতিও একই।'

এটি কি সবার জন্য উপযোগী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধ-চিনি কিছু মানুষের জন্য উপকারী হলেও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। ডা. কালরা সতর্ক করে বলেন, 'ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, PCOS, স্থূলতা বা হজমজনিত সমস্যায় ভোগা মহিলাদের অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা উচিত। একইভাবে, ল্যাকটোজ সহ্য করতে পারে না এমন শিশুদের ক্ষেত্রে দুধ খেলে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে।' ডা. নাগপাল আরও জানান, ফুল-ফ্যাট দুধ গরমকালে অনেকের পেটে ভারী লাগতে পারে এবং হজমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর বক্তব্য, 'যাঁদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা, IBS বা SIBO রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে, যা শরীর থেকে আরও বেশি জল বের করে দেয়। অর্থাৎ উদ্দেশ্যের ঠিক উল্টো ফল হতে পারে।' তাঁর মতে, 'সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এটি ক্ষতিকর নয়, তবে একে ডিহাইড্রেশনের চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রকৃত ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকিতে ওআরএস, ডাবের জল, নুন-লেবুর শরবত, রাগি আম্বালি, কানজি এবং ঘোলের মতো পানীয় অনেক বেশি কার্যকর। দুধ-চিনি বরং একটি ঐতিহ্যগত আরামদায়ক পানীয়, ক্লিনিক্যাল রিহাইড্রেশন নয়।'

গরমে শরীর হাইড্রেট রাখার বিকল্প
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটওয়েভের সময় একটি পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সঠিক হাইড্রেশন কৌশল মেনে চলা জরুরি।

এই বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে—

> ঘোল ও লস্যি
> ডাবের জল
> নুন-চিনি মেশানো লেবুর শরবত
> ঘরোয়া ইলেকট্রোলাইট ড্রিঙ্ক
> অতিরিক্ত চিনি ছাড়া ফলের স্মুদি
> তরমুজ, বাঙ্গি, শসা ও কমলালেবুর মতো জলসমৃদ্ধ মৌসুমি ফল

এই খাবার ও পানীয় শরীরে প্রাকৃতিকভাবে জল, ইলেকট্রোলাইট এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। ডা. নাগপাল শিশু ও অতিরিক্ত পরিশ্রম করা ব্যক্তিদের জন্য গুলকন্দ মেশানো দুধের কথাও বলেছেন, তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, 'একই সমাধান সবার জন্য কার্যকর নয়।' বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সুস্থ ব্যক্তিরা পরিমিত পরিমাণে দুধ-চিনি গরমকালে খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে রাখতে পারেন। তবে এটি কখনওই জল, ORS বা প্রমাণিত হাইড্রেশন পদ্ধতির বিকল্প নয়। চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করা, দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে চলা, হালকা সুতির পোশাক পরা এবং জলসমৃদ্ধ মৌসুমি খাবার খাওয়া। যাতে ডিহাইড্রেশন গুরুতর হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়।

Advertisement

 

POST A COMMENT
Advertisement