ডাল, ভাত, রুটি খেলেও ডায়াবেটিস হবে না, কী করে? বোঝালেন মাধুরীর ডাক্তার স্বামীভাত, রুটি এবং ডাল বেশিরভাগ ভারতীয় পরিবারেরই প্রধান খাবার। কিন্তু দেশে ডায়াবেটিসের হার বৃদ্ধি দেখে অনেকেই এর জন্য দায়ী করছেন সুগার বা শর্করা যুক্ত খাবারকে। এরপরেই প্রশ্ন ওঠে, ভারতীয়দের কি সত্যিই তাদের পাতে কী থাকছে তা নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত? কার্ডিওভাসকুলার ও থোরাসিক সার্জন এবং পাথফাইন্ডার হেলথ সায়েন্সেসের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্রীরাম নেনে কিন্তু মনে করেন, এর সমাধান ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় খাবার বাদ দিয়ে দেওয়ার মধ্যে না। বরং আমরা কীভাবে তা খাই তা বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে-র হেলথওয়েলথ সামিটে '21 Days to Good Health' নামক একটি বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে চিকিৎসক ও বলিউড তারকা মাধুরী দীক্ষিতের স্বামী নেনে ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে ভারতীয়েরা তাঁদের পছন্দের খাবার প্লেটে রেখেউ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
বর্তমানে আনুমানিক ১০.১ কোটি ভারতীয় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আরও ১৩.৬ কোটি মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মাদ্রাজ ডায়াবেটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (MDRF) এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ-এর ICMR-INDIAB সমীক্ষায় ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে কার্বোহাইড্রেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে মোট শক্তি গ্রহণের ৬২.৩% আসে পরিশোধিত শস্য এবং চিনিসহ নিম্নমানের কার্বোহাইড্রেট থেকে। ফলে ভারতে বাড়ছে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা।
তাহলে কী বদলাতে হবে?
ভাত বা রুটি আসল সমস্যা নয়। নেনে জানিয়েছেন, ভারতীয়দের জীবনযাপন ও কর্মপদ্ধতিতে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তাঁদের খাদ্যাভ্যাস সবসময় সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। তিনি বলেন, "দক্ষিণ এশীয়রা হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো কিছু রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।" এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত ব্যাখ্য়া করতে গিয়ে তিনি জানান, ভারত একসময়কার কৃষিভিত্তিক সমাজ, যেখানে মানুষ শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখান থেকে ক্রমশ ডেস্কে চাকরি ও অলস জীবনযাত্রা-প্রধান একটি সমাজে রূপান্তরিত হয়েছে।
তিনি বলেন, "এখন আমরা শিল্পযুগে আছি। আরও বেশি মানুষ IT সেন্টার, BPO এবং অন্য এমন জায়গায় কাজ করছে যেখানে মেধাভিত্তিক পুঁজির গুরুত্ব বেশি। এর সঙ্গে যোগ করুন হাই এনার্জি যুক্ত খাবার এবং তা খুব, খুব দ্রুত অর্ডার করলেই হাতে চলে আসছে। ফলে এটি সামগ্রিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে।"
চিকিৎসক জানাচ্ছে,উদ্বেগের বিষয় শুধু সুগার জাতীয় খাবার খাওয়া নয়। এর সঙ্গে আরও জড়িত আছে আমরা কী পরিমাণে খাচ্ছি? সেই শর্করার গুণমান এবং সারাদিনে আমরা কী পরিমাণ শক্তি ব্যয় করছি? তার উপরেও নির্ভর করে। ব্যক্তিগত চাহিদার কথা মাথায় রেখে সঠিক অনুপাতে ভারতীয় খাবার খাওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন শ্রীরাম নেনে।
ব্যক্তিগত চাহিদা বলতে বোঝায়, ধরে নেওয়া যাক একজন ক্রীড়াবিদ যিনি নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তার বেশি কার্বোহাইড্রেটের প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে যিনি দিনের বেশিরভাগ সময় ডেস্কে বসে কাটান তার প্রয়োজন হবে কম।
একটি সুষম ভারতীয় খাবারের প্লেট কেমন হওয়া উচিত?
কঠোর খাদ্যতালিকা মেন চলার পরিবর্তে নেনে একটি সহজ প্লেট-ভিত্তিক পদ্ধতির পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, প্লেটের অর্ধেক অংশে আঁশযুক্ত সবজি, এক-চতুর্থাংশে প্রোটিন এবং বাকি এক-চতুর্থাংশে অপরিশোধিত জটিল শর্করা থাকা উচিত। এতে খাবারের বৈচিত্র বাড়ে।
ভারতীয় খাবারের ক্ষেত্রে,এর অর্থ হতে পারে রুটি বা ভাতের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে সবজি এবং প্রোটিনের কোনও উৎস খাওয়া। একই সঙ্গে খাবারের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা ও সম্ভব হলে কম পরিশোধিত শর্করা জাতীয় খাবার বেছে নেওয়া। এক্ষেত্রেও মানুষের কাজ ও তাঁর লাইফস্টাইল ভেদে এই খাবার কম বেশি হতে পারে।
চিনি কি খাওয়া যাবে?
অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়ার পক্ষে নেনে। তিনি মনে করেন, এক্ষেত্রে ধারাবাহিক পরিবর্তন একটি বড় পার্থক্য আনতে পারে। তিনি একটি সাধারণ অভ্যাস দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন এক সপ্তাহের জন্য চা বা কফিতে চিনি দেওয়া বন্ধ করুন, এই পরীক্ষাটি ১৪ দিন পর্যন্ত বাড়ান এবং তারপর ২১ দিন চেষ্টা করুন। লক্ষ্য হল, অতিরিক্ত মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।
সুগার ফ্রি প্রোডাক্ট কি ভালো অপশন?
চিনির বদলে কোনও অন্য ধরনের মিষ্টিজাতীয় কিছু ব্যবহার করলেই যে পুরো খাবারটি স্বাস্থ্যকর হয়ে যায়, এমনটা ধরে নেওয়ার বিরুদ্ধে নেনে সতর্ক করেছেন। অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যালোরি-ভিত্তিক খাবার খাওয়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডায়েট ড্রিঙ্ক বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মূল বার্তা ছিল, চিনিমুক্ত পণ্যকে ছাড়পত্র হিসেবে না দেখে বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর মনোযোগ দেওয়া।