বিনামূল্যে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের টিকা সম্প্রতি স্তন ক্যানসার ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। এর কারণ যেমন বাড়তে থাকা ওজন, তেমনই জীবনযাত্রায় নানা অনিয়ম। চল্লিশোর্ধ্ব মহিলাদের ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যানসার সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে যাঁরা আগে এইচপিভি টিকা নেননি, তাঁদের ঝুঁকি বেশি। জরায়ুমুখ ক্যানসার বা সার্ভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে রাজ্যে এবার শুরু হতে চলেছে টিকাকরণ কর্মসূচি, তাও বিনামূল্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং একথা জানিয়েছেন।
১৪ বছর বয়সি কিশোরীরা এই টিকা পাবে। রাজ্যে টিকা পাবে ১০ লক্ষাধিক কিশোরী। এজন্য ব্যবহৃত হবে ইউ উইন পোর্টাল। মঙ্গলবার এইনিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বাস্থ্য দফতর। তারা জানিয়েছে, টিকাকরণ চলবে সোম থেকে শনিবার। দেশজুড়ে প্রাথমিক এবং ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রভৃতি জায়গায় এই ভ্যাকসিনেশন হচ্ছে। ফ্রি টিকাকরণের জন্য ইতিমধ্যেই ৭ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি টিকা ডোজ রাজ্যে চলে এসেছে।
ভারতে মহিলাদের মধ্যে যেসব ক্যানসার সবচেয়ে বেশি হয়, সেই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে সার্ভাইক্যাল বা জরায়ুমুখের ক্যানসার। ২০২৪ সালে শুধু এই ক্যানসারেই আক্রান্ত হন নানা বয়সি ৭৮,৪৯৯ জন মহিলা। তাঁদের অর্ধেকের বেশির মৃত্যুও হয়। ক্যানসারের প্রথম পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য উপসর্গ থাকে না। পরে জরায়ুমুখে রক্তপাত, কোমর ও কুঁচকিতে ব্যথা, ফিসচুলা প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যায়। সারা ভারতেই ফ্রিতে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের কর্মসূচি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার অংশ হিসেবেই এবার সার্ভাইকাল ক্যানসারের টিকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকারও৷ ৩০ মে টিকা দেওয়া শুরু হবে৷ ৩০ মে বিধাননগর হাসপাতালে এর সূচনা করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা রাজ্যে ৭ লক্ষেরও বেশি কিশোরীকে এই জীবনদায়ী প্রতিষেধক প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীদের সার্ভিক্যাল ক্যানসার বা জরায়ু ক্যানসারের প্রতিষেধক দেওয়া হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সার্ভিক্যাল ক্যানসার আসলে জরায়ু মুখ ক্যানসার। মহিলাদের জরায়ুর নিচের অংশ, যা যোনির সঙ্গে যুক্ত থাকে (সার্ভিক্স), মূলত সেখানে এই ক্যানসারের উৎপত্তি হয়। এই মারণ রোগের প্রধান কারণ হল, ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস’ বা এইচপিভি (HPV)-এর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞরা জানান, এই রোগটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হল, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের প্রায় কোনও সুস্পষ্ট উপসর্গই শরীরে ফুটে ওঠে না। যখন অনিয়মিত রক্তপাত, তলপেটে বা কোমরে তীব্র ব্যথার মতো উপসর্গগুলো প্রকাশ পায়, তখন রোগটি অনেক ক্ষেত্রেই অ্যাডভান্সড স্টেজে পৌঁছে যায় এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তখন চিকিৎসকদের পক্ষে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব জুড়ে এইমুহুর্তে সার্ভাইক্যাল ক্যানসার এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতি বছর প্রায় ৬ লক্ষ মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতি বছর মৃত্যুহারের পরিমাণ বাড়ছে প্রায় ৩.৪ লক্ষ। টিকাকরণের আগে প্রাপকদের নাম বাধ্যতামূলক ভাবে কেন্দ্রীয় ইউ–উইন প্ল্যাটফর্মে নথিভুক্ত করা হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)–র তথ্য অনুযায়ী, জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই এইচপিভি সংক্রমণ দায়ী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই টিকা জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে ৯৩ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। বেসরকারি ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে এই টিকা পাওয়া গেলেও অনেকটা দামের কারণে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। এ বার কেন্দ্রীয় উদ্যোগে বিনামূল্যে এই টিকা দেওয়া হবে। এই ক্যানসার প্রতিহত করতে টিকাকরণের উপর জোর দিয়েছে কেন্দ্র। অর্থাৎ সময়ে টিকা নিয়ে নিলে ক্যানসার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ প্রতিহত করা সম্ভব।
৩ মাসের কর্মসূচি
রাজ্যে এই কর্মসূচি তিন মাসব্যাপী বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। জুন মাসে স্কুলভিত্তিক মাইক্রোপ্ল্যানিং, লাইন-লিস্টিং এবং বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষার কাজ চলবে, জুলাই মাসে মূল টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হবে এবং অগাস্ট মাসে বাদ পড়া উপভোক্তাদের জন্য মপ-আপ কর্মসূচি পরিচালিত হবে। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মী, টিকাদান কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
কোথায় মিলবে ফ্রি ভ্যাকসিন
টিকাকরণ শুধুমাত্র সেই সব সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করা হবে যেখানে কার্যকর কোল্ড চেইন সংরক্ষণ ব্যবস্থা , টিকাকরণের পর কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট মেডিক্যাল অফিসার এবং ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত টিকাকরণ সেশন চলবে এবং প্রয়োজনে সরকারি ছুটি ও সপ্তাহান্তেও এই পরিষেবা চালু রাখা হতে পারে। প্রতিটি টিকাকরণ কেন্দ্র নিকটবর্তী ২৪×৭ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবে যাতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দ্রুত প্রদান করা যায়। টিকা নেওয়ার আগে কিশোরীদের খালি পেটে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং টিকা নেওয়ার পর অন্তত ৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
জেনে নিন নিয়মকানুন
উপভোক্তারা U-WIN ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন, স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তায় প্রি-রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন অথবা সরাসরি কেন্দ্রেও রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। সমস্ত ভ্যাকসিন মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা eVIN-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। U-WIN পোর্টাল থেকে টিকাকরণ সার্টিফিকেট ডাউনলোড করা যাবে এবং প্রয়োজনে হার্ড কপিও পাওয়া যাবে। তিন মাসের বিশেষ অভিযানের সময় প্রতিটি উপভোক্তার বাঁ হাতের তর্জনীতে চিহ্ন দেওয়া হবে। যেসব কিশোরী মাঝারি বা গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছে, যাদের ইস্টের প্রতি অ্যালার্জি বা পূর্বে কোনও টিকায় গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হয়েছে এবং গর্ভবতী মহিলারা এই টিকাকরণের আওতার বাইরে থাকবে। ১৪ বছর বয়সি কিশোরীদের যৌন সক্রিয় হওয়ার আগেই এই টিকা প্রদান করা হবে এবং যেসব কিশোরীর বয়স কর্মসূচি শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে ১৫ বছরে পৌঁছাবে, তারাও এই বিশেষ তিন মাসের অভিযানের আওতায় টিকা পাওয়ার যোগ্য হবে।