সপ্তাহে একবার ইনসুলিনভারতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আর এই সব রোগীদের মধ্যে অনেককেই রোজ এক বা একাধিকবার ইনসুলিন নিতে হয়। তাই তাঁরা বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিরক্ত হন। এমনকী এই ভয়ে ইনসুলিন থেরাপি শুরু করতেই চান না অনেকে। যদিও এই সমস্য়ার এবার সহজ সমাধান নিয়ে এল ডেনমার্কের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা নোভো নরডিস্ক। তারা ভারতে লঞ্চ করল 'আউইকলি' বা ইনসুলিন আইকোডেক। সপ্তাহে একবার এই ইনসুলিন নিলেই কাজ হবে। কন্ট্রোলে থাকবে সুগার।
সংস্থার দাবি, এটি সপ্তাহে একবার নেওয়ার জন্য প্রস্তুত প্রথম বেসাল ইনসুলিন। এটি টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে কাজ করে। আর এই খবর সামনে আসার পরই খুশি ডায়াবেটিস রোগীদের একাংশ। তবে তাঁদের মনে কিছু প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। এই যেমন, কীভাবে কাজ করে এই ইনসুলিন? কতটা কার্যকরী? এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই তো?
এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কনসালটেন্ড এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা: সোহম তরফদার জানালেন, আউকলি একটি দীর্ঘস্থায়ী বেসাল ইনসুলিন। এটি টানা সাত দিন পর্যন্ত রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। বর্তমানে ব্যবহৃত দীর্ঘস্থায়ী ইনসুলিন, যেমন গ্লার্জিন বা ডেগলুডেক-এর ক্ষেত্রে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বজায় রাখতে চাইলে প্রতিদিন একটি করে ইঞ্জেকশন নিতে হয়। কিন্তু আউকলি-এর ক্ষেত্রে সেই ঝামেলা নেই। এক্ষেত্রে প্রতিদিনের বদলে সপ্তাহে মাত্র একবার ইঞ্জেকশন নিলেই কাজ হয়।
কীভাবে কাজ করে এই ইনসুলিন? এই উত্তরটাও দিয়েছেন তিনি। ডা: তরফদার বলেন, 'আমাদের রক্তে থাকা অ্যালবুমিন নামক একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের ওপর নির্ভর করে এই ইনসুলিন কাজ করে। ত্বকের নীচে আউইকলি ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর এটি অ্যালবুমিনের সঙ্গে শক্তভাবে জুড়ে যায়। তাতে একটি সাময়িক স্টোরেজ পুল বা ভাণ্ডার তৈরি করে। এই ভাণ্ডার থেকেই সক্রিয় ইনসুলিনটি পুরো সপ্তাহ জুড়ে ধীরে ধীরে, স্থিতিশীলভাবে বেরিয়ে আসে। এই কার্যপদ্ধতিতে ইনসুলিনের মাত্রায় হঠাৎ কোনও বড় স্পাইক রোধ করা যায়।'
গবেষণা কী বলছে?
সংস্থা দাবি করেছে, এই ইনসুলিন টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সুগার ফল বা হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত না করে এইচবিএ১সি ৭ শতাংশের নীচে নামাতে পারে।
যদিও এই দাবি এখনই মানতে নারাজ বিশিষ্ট ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা: আশিস মিত্র। তিনি মনে করছেন, এই ইনসুলিনের অধিকাংশ স্টাডি হয়েছে বিদেশে। সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, জিনের গঠন ও শারীরক গঠন এক নয়। তাই ভারতের স্থূলকায়, পেট চর্বি থাকা মানুষের মধ্যে এই ওষুধ কতটা কাজ করবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
পাশাপাশি তিনি মনে করছেন, এই ধরনের ইনসুলিন নিতে মানুষ ভুলে যেতে পারেন। পাশাপাশি এর ডোজ ঠিক করতেও চিকিৎসকরা সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। তবে এই ইনসুলিন ঠিক ঠাক কাজ করলে রোগী উপকৃত হবে বলেই মনে করছেন তিনি।
এই ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে মুখ খোলেন ডা: তরফদারও। তিনি বলেন, 'যে কোনও ইনসুলিনের মতোই এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হল হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে সুগারের মাত্রা অনেকটা কমে যাওয়া। যেহেতু এটি পুরো এক সপ্তাহ শরীরের ভেতরে কাজ করে, তাই রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা খুব ভালোভাবে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যখন এটি প্রথমবার শুরু করা হয় বা এর ডোজ পরিবর্তন করা হয়, তখন পর্যবেক্ষণ জরুরি।'
যদিও এই ইনসুলিন নিয়ে ভীষণ আশাবাদী বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: রুদ্রজিৎ পাল। তিনি বলেন, 'অনেক রোগীই ইনসুলিন নিতে ভয় পান। তাঁদের জন্য এটা খুবই ভাল বিকল্প। এটা রোজ রোজ নিতে হবে না।'
এছাড়া তাঁর মতে, এই ইনসুলিন ইতিমধ্যেই অনেক ট্রায়ালের মধ্যে দিয়ে এসেছে। তাই এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। যদিও এর দাম বেশির দিকে হওয়ায় কতজন এটা ব্যবহার করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন এই চিকিৎসক।
তাই সবমিলিয়ে এটা পরিষ্কার যে এই নয়া ইনসুলিন নিয়ে বাংলার চিকিৎসকেরা আশাবাদী। তবে এখনও কেউই সেভাবে এই ইনসুলিন প্রেসক্রাইব করেননি। বরং তাঁরা অনেকগুলো বিষয় মাথায় রেখেই এই নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিদ্র: এটা একটি সাধারণ প্রতিবেদন। কোনও ওষুধ খাওয়ার আগে বা কোনও চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।