স্মার্টফোন - প্রতীকী ছবিমোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমোলেন। পরের দিন অ্যালার্ম বাজতেই আপনি উঠে পড়লেন। মোবাইলের অ্যালার্ম বন্ধ করলেন। তারপরেই আপনি হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ই-মেল ইত্যাদি চেক করতে শুরু করে দিলেন। অর্থাত্ ঘুম থেকে উঠেই আপনি মোবাইলে আগে সব দেখে নিলেন। তারপর বাকি কাজ। এই রকম অভ্যাস আছে নাকি? অনেকেই একে স্মার্টফোন অ্যাডিকশন বা স্মার্টফোন আসক্তি বলেন। আসলে এটা স্মার্টফোন আসক্তি নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু। এবং মনস্তাত্ত্বিক ভাবে বেশি জটিল একটি বিষয়।
মনোবিদদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন দেখার অভ্যাসের পিছনে রয়েছে অভ্যাস গঠন, অনিশ্চয়তা দূর করার প্রবণতা, নতুন কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক তথ্য জানার চাহিদা।
রাতারাতি কী বদলেছে, সেটাই জানতে চায় মস্তিষ্ক
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Uncertainty Reduction বা অনিশ্চয়তা কমানোর প্রবণতা। আপনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখনও পৃথিবী থেমে থাকেনি। কোনও গুরুত্বপূর্ণ ই-মেল আসতে পারে, বন্ধু মেসেজ পাঠাতে পারেন, অফিসের মিটিং বদলে যেতে পারে কিংবা বড় কোনও খবর ঘটতে পারে। তাই ঘুম ভাঙার পর ফোন দেখে মস্তিষ্ক নিশ্চিত হতে চায়, রাতারাতি কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে কি না। ধরুন, সেদিন আপনার চাকরির ইন্টারভিউ বা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এমন পরিস্থিতিতে কোনও বার্তার অপেক্ষায় না থাকলেও ফোন দেখার প্রবণতা বেড়ে যায়। কারণ, মস্তিষ্ক আগে জানতে চায় সব কিছু ঠিক আছে কি না।
অভ্যাস অনেক সময় ইচ্ছাশক্তির থেকেও শক্তিশালী
মনোবিজ্ঞানের হ্যাবিট লুপ থিওরি বলছে, একই পরিস্থিতিতে বারবার কোনও কাজ করলে তা একসময় স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়। সকালে ঘুম ভাঙা সেই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিগুলির মধ্যে অন্যতম। অ্যালার্ম বন্ধ করতে গিয়েই ফোন হাতে চলে আসে। তারপর মেসেজ, নোটিফিকেশন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া, এভাবেই প্রতিদিনের অভ্যাস তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্যু রুটিন রিওয়ার্ড লুপ। ক্যু (সঙ্কেত): ঘুম থেকে ওঠা। রুটিন (অভ্যাস): ফোন চেক করা। রিওয়ার্ড (প্রাপ্তি): নতুন কোনও তথ্য, মেসেজ বা নিশ্চিন্ত হওয়ার অনুভূতি।
সব দিন নতুন কিছু না পেলেও কেন দিনের শুরুতে প্রথমেই ফোন দেখেন?
এর উত্তর রয়েছে ভ্যারিয়েবল রিওয়ার্ড ধারণায়। প্রতিদিন ফোনে একই রকম কিছু থাকে না। কোনও দিন পুরনো বন্ধুর মেসেজ, কোনও দিন গুরুত্বপূর্ণ ই-মেল, কোনও দিন প্রশংসাসূচক মন্তব্য, আবার কোনও দিন কিছুই নয়। এই অনিশ্চিত পুরস্কারই মস্তিষ্ককে বারবার ফোন দেখতে উৎসাহিত করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তনশীল পুরস্কারই কোনও অভ্যাসকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
ফোন দেখে দিনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন অনেকেই
একটানা কয়েক ঘণ্টা ঘুমের পর মানুষ সাময়িকভাবে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। ঘুম ভাঙার পর ফোন দেখা অনেকের কাছে নতুন দিনের সঙ্গে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার উপায়।
তা হলে কি সকালে ফোন দেখা ক্ষতিকর?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সব সময় নয়। যদি কয়েক সেকেন্ড বা এক-দু'মিনিট ফোন দেখে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে দিন শুরু করেন, তা স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু সেই কয়েক মিনিট যদি ৩০-৪৫ মিনিটের অন্তহীন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিংয়ে পরিণত হয়, তাহলে তা মনোযোগ, কাজের উৎপাদনশীলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।