
পাফার ফিশ আধুনিক ডেটিংয়ের দুনিয়া বেশ জটিল। এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, রোজ যেন নতুন নতুন ডেটিং ট্রেন্ড তৈরি হচ্ছে। একটা ট্রেন্ড বুঝে উঠতে না উঠতেই এসে হাজির হচ্ছে আরও একটা। আর এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তেমনই এক নতুন শব্দবন্ধ— ‘পাফার-ফিশিং’ (Puffer-fishing)। না, এর সঙ্গে মাছ খাওয়া বা সমুদ্রের কোনও সম্পর্ক নেই!
কী এই 'পাফার-ফিশিং'?
মানুষের এই ধরনের স্বভাব খুব একটা নতুন নয়, তবে হালে এটি একটি ভাইরাল নাম পেয়েছে। পাফার ফিশ বিপদের আঁচ পেলেই যেমন কাঁটা ফুলিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তেমনই। সম্পর্ক যখনই একটু সিরিয়াস বা গভীর হতে শুরু করে, ঠিক তখনই কেউ কেউ আবেগগতভাবে দূরে সরে যেতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, তারা হঠাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন (যাকে চলতি কথায় বলে 'ঘোস্টিং') বা সোজাসুজি ব্রেক-আপ করে বসেন।

‘হোয়াই ডু আই কিপ ডুইং দিস?’ বইয়ের লেখিকা কেটি মর্টন এই ধারণাকে প্রথম জনপ্রিয় করেন। মর্টন জানান, যখন তার বয়স কুড়ির কিছুটা বেশি ছিল, সেসময় নিজের থেরাপিস্টের কাছ থেকেই প্রথমবার শব্দটি শুনেছিলেন তিনি। কারণ, সে সময় তাঁর নিজেরও কোনও সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছিল না। তাঁর থেরাপিস্ট তখন বলেছিলেন, “তুমি আসলে একটা পাফার ফিশ! কেউ খুব কাছাকাছি চলে এলে এবং তুমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেই, কথা বলার বদলে গায়ে কাঁটা ফুটিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নাও।” থেরাপিস্ট বুঝিয়েছিলেন, এই আচরণের মূলে রয়েছে মানসিক দুর্বলতা প্রকাশ করার ভয়।
কীভাবে চিনবেন এই ধরনের মানুষদের?
দিল্লির রিলেশনশিপ এক্সপার্ট রুচি রুহ-র মতে, শুরুতে এদের চেনা বেশ কঠিন। কারণ প্রথম দিকে এরা অত্যন্ত স্নেহশীল, আবেগময় এবং সম্পর্কের প্রতি মারাত্মক যত্নশীল হন। গোলমাল বাধে সম্পর্কটা ক্যাজুয়াল পর্যায় থেকে গভীর হতে শুরু করলে।
রুচি বলছেন, “এদের মধ্যে একটা অদ্ভুত 'হট-অ্যান্ড-কোল্ড' এনার্জি কাজ করে। যে মানুষটা এক মুহূর্ত আগে আপনার কাছাকাছি আসার জন্য পাগল ছিল, পর মুহূর্তেই সে সেই সম্পর্কের বাঁধনে নিজেকে আটকে পড়া বা দমবন্ধ করা অবস্থায় অনুভব করে। সম্পর্ক সিরিয়াস হতে শুরু করলেই এরা মানসিকভাবে দূরে সরে যান, আপনার খুঁত ধরতে শুরু করেন বা কোনও কারণ ছাড়াই এড়িয়ে চলেন।”
সবচেয়ে মুশকিল হয় কোনও সিরিয়াস বা ‘বাস্তব’ আলোচনার সময়। সমস্যার কথা খোলাখুলি বলার বদলে এরা গুটিয়ে যান, দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলেন বা পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তারপর হয়তো কিছুদিন পর হঠাৎ এমনভাবে ফিরে আসেন, যেন কিছুই হয়নি! আশা করেন, যেখান থেকে সম্পর্কটা ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই আবার সব শুরু হবে। এটিই হল ক্লাসিক ‘পাফার ফিশ’ আচরণ।
দোষটা আসলে কার?
রুচির মতে, এর শিকড় লুকিয়ে থাকতে পারে ছোটবেলার পরিবেশে। যারা এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন যেখানে আবেগের কোনও দাম ছিল না, অভিভাবকের আচরণে অসঙ্গতি ছিল বা ভালোবাসা ছিল শর্তসাপেক্ষ, তাদের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা এক ধরনের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভাবেন, আবেগ প্রকাশ করলেই হয়তো কেউ তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে। তবে এর মানে এই নয় যে, সম্পর্কে কেউ একটু ‘স্পেস’ চাইলেই তিনি পাফার ফিশ। সুস্থ সম্পর্কে স্পেস চাইলে তার সঙ্গে সঠিক বোঝাপড়াও থাকে, যাতে সঙ্গীর মনে কোনও অহেতুক ভয়ের সৃষ্টি না হয়।
এরা কি খুব খারাপ মানুষ?
একেবারেই নয়। রুচি রুহ-র মতে, “কারও মধ্যে সম্পর্ক এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকলেই সে খারাপ মানুষ হয়ে যায় না। দেখতে হবে, নিজের সমস্যাটা বুঝতে পারার পর সে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছে কি না।”
অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যান না, তাঁরা আসলে নিজেদের আবেগ নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তবে এই আচরণের কারণে সঙ্গীর মানসিক উদ্বেগ বাড়তে থাকলে এবং বারবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে সম্পর্কটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠতে বাধ্য।
সমাধানের রাস্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, থেরাপি, নিজের প্রতি যত্ন এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে ঠিক কোন কারণে এই ভয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। অস্বস্তি থেকে পালিয়ে না গিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। রুচি যোগ করেন, “বারবার পালিয়ে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। আবেগ বা দুর্বলতা নিয়ে লড়াই করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু তার ফলে অন্য একজনের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তার দায় না নেওয়াটা কাজের কথা নয়।”
পাফার-ফিশিং থেকে বেরিয়ে আসার মূল মন্ত্র হল এটা বুঝতে শেখা যে, মানুষের কাছে দুর্বলতা প্রকাশ করা মানেই তা বিপদের সঙ্কেত নয়। আর সব কঠিন অনুভূতির উত্তর পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। তাই সম্পর্কের সমুদ্রে ভরসা রেখে সাঁতার কাটে যাওয়াটাই আসল।