এসি গরমকাল মানেই নানা রকম শারীরিক অস্বস্তি আর অসুখ- বিসুখের চোখ রাঙানি। অনেকেই বুঝতে পারেন না, কেন হঠাৎ করে তাঁদের শরীর খারাপ হচ্ছে। অফিসে বা বাড়িতে দীর্ঘক্ষণ এসিতে (AC) থাকার পর অনেকেই সরাসরি কড়া রোদে বেরিয়ে পড়েন। আবার কাঠফাটা রোদ থেকে ঘেমে-নেয়ে ফিরেই সোজা এসির ঠান্ডা হাওয়া খেতে বসে পড়েন। আর এখানেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ভুল!
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় শরীরের তাপমাত্রার এই হঠাৎ পরিবর্তনকে বলা হয় 'থার্মাল শক'। ২০-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কনকনে ঠান্ডা ঘর থেকে হঠাৎ করে ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রখর গরমে গেলে, সেই তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শরীরের বেশ কিছুটা সময় লাগে।
শরীরের ওপর এর কী কী প্রভাব পড়ে?
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া: তাপমাত্রার এই হঠাৎ ওঠা-নামায় শরীরের নিজস্ব ডিফেন্স মেকানিজম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা এবং ভাইরাল ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেন: এসির ঠান্ডায় আমাদের রক্ত নালিগুলি সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। হঠাৎ করে গরমে গেলে সেগুলি আবার প্রসারিত হয়। এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে তীব্র মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যা শুরু হতে পারে।
ত্বকের সমস্যা ও অ্যালার্জি: শুষ্ক ঠান্ডা হাওয়া থেকে হঠাৎ আর্দ্রতা ও ঘামের সংস্পর্শে এলে ত্বকের রোমকূপগুলি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে র্যাশ, চুলকানি ও ঘামাচির মতো সমস্যা দেখা দেয়।
নিম্ন রক্তচাপ ও মাথা ঘোরা: হঠাৎ করে প্রখর গরমে গেলে রক্তনালিগুলি চওড়া হয়ে যায়, যার ফলে রক্তচাপ হঠাৎ করে কমে যেতে পারে। এটা হলে মাথা ঘোরা বা চোখের সামনে অন্ধকার দেখার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হল, শরীর যদি এই থার্মাল শক একেবারেই সামলাতে না পারে, তবে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে 'হিট স্ট্রোক' পর্যন্ত হতে পারে।
এই বিপদ থেকে বাঁচবেন কীভাবে?
দৈনন্দিন জীবনে সামান্য কয়েকটি সতর্কতা মেনে চললেই এই থার্মাল শক থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব:
বেরনোর আগে এসি বন্ধ করুন: বাড়ি বা অফিস থেকে বেরনোর অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট আগে এসি বন্ধ করে দিন। এতে ঘরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে এবং আপনার শরীরও বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন: শপিং মল বা অফিস থেকে বেরিয়েই সরাসরি কড়া রোদে যাবেন না। ২-৩ মিনিট করিডোর, লবি বা এসি নেই এমন জায়গায় দাঁড়ান, যাতে শরীরের তাপমাত্রা ব্যালেন্স হওয়ার সময় পায়।
ফিরেই ঠান্ডা জল খাবেন না: এটি সবচেয়ে জরুরি নিয়ম! বাইরে থেকে ফিরেই ফ্রিজের কনকনে ঠান্ডা জল খাওয়ার মারাত্মক ভুল করবেন না। প্রথমে ফ্যানের তলায় বসে ঘাম শুকিয়ে নিন। শরীর একটু স্বাভাবিক হলে তবেই সাধারণ তাপমাত্রার জল বা মাটির কলসির জল খান।
এসির তাপমাত্রা সঠিক রাখুন: ঘর বা গাড়ির এসির তাপমাত্রা সবসময় ২৪°C থেকে ২৬°C-এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। এতে বাইরের এবং ভেতরের তাপমাত্রার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য তৈরি হয় না, ফলে শরীরের ওপর আচমকা চাপ পড়ে না।
যাদের কাজের প্রয়োজনে বারবার এসি থেকে রোদে এবং রোদ থেকে এসিতে যাতায়াত করতে হয়, তাঁরা অবশ্যই সঙ্গে একটি সুতির স্কার্ফ, গামছা বা টুপি রাখুন। রোদে বেরনোর সময় মাথা ও শরীর ঢেকে নিন, যাতে গরম লু বা রোদ সরাসরি গায়ে না লাগে। একটু সচেতনতাই এই গরমে আপনাকে সুস্থ রাখতে পারে।