
৩৫ বছর পেরিয়ে মা হওয়া কি হৃদপিণ্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ? চিকিৎসকদের মতে, হ্যাঁ। ঝুঁকি আগের চেয়ে বাড়ছে। তাই গর্ভাবস্থায় হার্ট অ্যাটাকের নীরব লক্ষণগুলো জানা এবং সময়মতো সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
একসময় মনে করা হতো, গর্ভাবস্থায় মহিলারা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সুস্থ থাকেন এবং এই সময়ে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, সেই ধারণা এখন আর ঠিক নয়। গত কয়েক বছরে গর্ভবতী ও সদ্য প্রসূত মহিলাদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঘটনা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি এক লক্ষ মহিলার মধ্যে প্রায় ৮৮ জন গর্ভাবস্থা বা প্রসব-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা যান। বার্ষিক হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ২২,৫০০। এর মধ্যে একটি অংশ হৃদরোগজনিত কারণের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমানে প্রতি এক লক্ষ প্রসবকারী মহিলার মধ্যে প্রায় ৩ জন তীব্র হার্ট অ্যাটাকের (অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন) শিকার হচ্ছেন। সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও, কয়েক দশক আগে যেখানে এই ঘটনা প্রায় শূন্য ছিল, সেখানে এই বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী মহিলার মধ্যে ১ থেকে ৪ জন কোনও না কোনও হৃদরোগজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
এই ঝুঁকি শুধু মায়ের জন্য নয়, গর্ভস্থ শিশুর জন্যও বিপজ্জনক। এতে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, এমনকি অকাল প্রসবের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
কেন বাড়ছে গর্ভাবস্থায় হার্ট অ্যাটাক?
চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণ নিজেই একটি বড় ঝুঁকির কারণ, কারণ এই বয়সে স্বাভাবিকভাবেই হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
এছাড়া দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার বা আইভিএফের মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে হরমোনের ভারসাম্যহীনতাও হৃদযন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘স্পন্টেনিয়াস করোনারি আর্টারি ডিসেকশন’-এর মতো বিরল কিন্তু গুরুতর সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, যেখানে হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীর দেওয়াল হঠাৎ ছিঁড়ে যায়।
গর্ভাবস্থায় হৃদপিণ্ডের উপর কী প্রভাব পড়ে?
গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে হৃদপিণ্ডকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। একই সঙ্গে, প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত রোধ করতে শরীর স্বাভাবিকভাবেই রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
লক্ষণ কেন সহজে ধরা পড়ে না?
গর্ভাবস্থায় হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের মতো স্পষ্ট হয় না। তীব্র বুকে ব্যথার পরিবর্তে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, ঘাম, পিঠ বা উপরের পেটে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণকে অনেক সময় গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করা হয়, ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
এই ধরনের জটিল কেস সামলাতে অভিজ্ঞ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রসূতি চিকিৎসক, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ও নবজাতক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত টিম প্রয়োজন। তবে বাস্তবতা হলো, সব হাসপাতালে এই সুযোগ-সুবিধা এখনও নেই।
তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের আগে থেকে হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের গর্ভাবস্থার শুরুতেই কার্ডিয়াক স্ক্রিনিং করানো উচিত। নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, হালকা ব্যায়াম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলা ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
চিকিৎসকদের স্পষ্ট পরামর্শ, গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে অস্বস্তি বা ব্যাখ্যাতীত শারীরিক পরিবর্তন হলে দেরি না করে অবিলম্বে হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করান। গর্ভাবস্থায় হার্ট অ্যাটাক বিরল হলেও, সতর্কতা আর সচেতনতাই পারে মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে।