Jaldapara National Park: রাজ্যে বন্যজন্তু দেখার সেরা ঠিকানা জলদাপাড়া, যোজন পিছিয়ে গরুমারা

হিন্দিতে একটা প্রবাদ আছে, পেহলে দর্শনদারি, বাদ মে গুণ বিচারি। অর্থাৎ প্রথমে অ্যাপিয়ারেন্সটা ভীষণ প্রভাব ফেলে মানুষের মনে। জিপটা দেখে তেমনই একটি অনুভূতি হয়েছিল। সাদা ঝাঁ চকচকে জিপসি। এবড়ো-খেবড়ো পথের উপর দিয়ে মাখনের মতো চলেছে। একটা গাড়ি চলার যতটুকু আওয়াজ না হলেই নয়, শব্দ দূষণ ছিল তেমনটাই।

Advertisement
রাজ্যে বন্যজন্তু দেখার সেরা ঠিকানা জলদাপাড়া, যোজন পিছিয়ে গরুমারাচলছে হাতিদের মাড বাথ। ছবি: রজত কর্মকার
হাইলাইটস
  • অনলাইনে আগে থেকে পারমিশন করানো ছিল।
  • কোভিড প্রোটোকল মেনে কাউন্টার থেকে জিপসি বুক করে কাগজ হাতে বেরিয়ে এলাম।
  • গাঢ় সবুজ রঙের ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। কাগজ হাতে নিয়ে বললেন, 'আমি আপনাদের গাইড। এটা আপনাদের জিপ। উঠে পড়ুন।'

'বড় আশা করে এসেছি গো...'

জঙ্গলে ঢোকার আগে মনে গুনগুন করে এই রবীন্দ্র সঙ্গীত আউড়ে চলেছি। সত্যিই তো, ডুয়ার্সের বন্য পরিবেশে গিয়ে যদি জন্তু না দেখতে পারি তার চেয়ে হতাশার আর কী হতে পারে! গরুমারার লাটাগুড়ি রেঞ্জ ধরে গাঢ় সবুজ রঙের জিপসি জঙ্গলের বুক চিড়ে একফালি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে। দু' পাশে যাত্রী এবং গাইডের সতর্ক দৃষ্টি। হঠাৎ যদি কিছু বেরিয়ে পড়ে এই আশায় গোটা রাস্তা গানই গুনগুন করে গেলাম। ঘণ্টা ২ পেরিয়ে চূড়ান্ত হতাশা আর গোটা দুই ময়ূর দেখে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে টিকিট কাউন্টারের সামনে এসে নামলাম গাড়ি থেকে।

জঙ্গলে ঘোরার বর্ণনার সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয়ে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করি। গাইড খানিক বাদে সামনের সিটে বসে ঘুমিয়ে পড়লেন। ড্রাইভার অত্যন্ত দ্রুত, প্রায় ৪০-৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গাড়িয়ে চালিয়ে গেলেন। গাড়ি দু পা চললে যে পরিমাণ ঝনঝন শব্দ হচ্ছিল তা শুনে কুম্ভকর্ণের ঘুমও ভেঙে যেতে পারত। এত শব্দে যদি মানুষের কষ্ট হয়, তবে জন্তুরা সেই পথ মারাবে কেন? এই হল গরুমারা জঙ্গলে সাফারি করার করুণ অভিজ্ঞতা।

কাট টু জলদাপাড়া। ঘটনার ২ দিন বাদে জলপাড়ায় দ্বিতীয়বার জঙ্গল সাফারির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। অনেক চেষ্টা করেও বিকেলের স্লট বুকিং পাওয়া যায়নি। ফলে দুপুর দেড়টা থেকে ৩টে পর্যন্ত যে স্লট তাতেই যেতে রাজি হয়েছিলাম। মনে তখন প্রচণ্ড হতাশা চেপে বসেছে। জঙ্গলপ্রেমীরা বলেন, বন্য জন্তু দেখার সেরা সময় ভোরবেলা অথবা পড়ন্ত বিকেল। ভরদুপুরে খামোখা কেনই বা গুটিকতক মানুষের মনোরঞ্জন করতে জন্তুর দল আসরে নামবে!

অনলাইনে আগে থেকে পারমিশন করানো ছিল। কোভিড প্রোটোকল মেনে কাউন্টার থেকে জিপসি বুক করে কাগজ হাতে বেরিয়ে এলাম। গাঢ় সবুজ রঙের ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। কাগজ হাতে নিয়ে বললেন, 'আমি আপনাদের গাইড। এটা আপনাদের জিপ। উঠে পড়ুন। আমরা এমনিতেই ১৫ মিনিট দেরি করে ফেলেছি।' পরে গাইডের নাম জেনেছিলাম, রামপ্রসাদ বিশ্বাস। জঙ্গলের মধ্যেই স্টাফ কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে থাকেন। বলা যায়, জঙ্গলই তাঁর ঘরবাড়ি।

Advertisement

দেরি হওয়ার কারণও ছিল অবশ্য। ছট পুজোর কারণে তোর্সা নদীতে কার্যত জন-অরণ্য। পথের দুধারে গাড়ির মেলা। ফলে রাস্তায় বহু ক্ষণ আটকে থাকতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যে পৌঁছানো গিয়েছিল তা এক প্রকার মিরাকল বললেও কম বলা হবে।

হিন্দিতে একটা প্রবাদ আছে, পেহলে দর্শনদারি, বাদ মে গুণ বিচারি। অর্থাৎ প্রথমে অ্যাপিয়ারেন্সটা ভীষণ প্রভাব ফেলে মানুষের মনে। জিপটা দেখে তেমনই একটি অনুভূতি হয়েছিল। সাদা ঝাঁ চকচকে জিপসি। এবড়ো-খেবড়ো পথের উপর দিয়ে মাখনের মতো চলেছে। একটা গাড়ি চলার যতটুকু আওয়াজ না হলেই নয়, শব্দ দূষণ ছিল তেমনটাই।

ধীরে ধীরে যত জঙ্গলের ভেতরে ঢুকেছি গাইড তত তথ্য দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। কোথায় গেলে জন্তু দেখার সম্ভাবনা বেশি সেটা তাঁর নখদর্পণে। জঙ্গলে ঢোকার সময় বেরিয়ে আসা গাড়ি বা মাচায় বসে থাকা ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে অঙুলের ইশারায় ক্রমাগত কথা বলে চলেছে, অথচ মুখে একটা কথা বলতে হচ্ছে না। ইশারাতেই জেনে নিলেন সামনেই একটা হাতির দল দেখা গিয়েছে। চালককেও দ্রুত গাড়ি সে দিকে নিতে নির্দেশ দিলেন। উত্তেজনায় আমাদের সকলের প্রায় দমবন্ধ হওয়ার জোগাড়।

প্রায় কিলোমিটার খানেক গিয়ে একটা বড় ওয়াচটাওয়ার রয়েছে। তারই পাশে কিছু লবনের পিট করা আছে। সেখানেই পশুরা নুন চাটতে আসে। হাতির দল সেখানেই দেখা গেল। প্রায় ১৫টি হাতি এক সঙ্গে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সদস্যের বয়স মাত্র ৭ দিন। এর মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে নিশ্চিন্তে জঙ্গল চষে ফেলছে সে। হাতি দেখার আনন্দে সকলে যখন আত্মহারা ঠিক সে সময় মঞ্চে প্রবেশ আরও এক জীবের। একটি পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ গণ্ডার। সম্ভবত অন্য গণ্ডারের সঙ্গে মারামারি করতে গিয়ে তার সাধের খড়্গটি ভেঙে ফেলেছে।

প্রায় ১৫ মিনিট ধরে এরা জায়গাটি দাপিয়ে বেড়াল। মাঝে মাটি দিয়ে স্নান করতে দেখা গেল হাতিদের। শেষে ধীরে ধীরে জঙ্গলে মিয়ে গেল দলটি। একটু বাদে চলে গেল গণ্ডারটিও। ১৫ মিনিট টানা ক্যামেরা থেকে চোখ না সরিয়ে একটানা ছবি তুলে গিয়েছি। কে জানে, আর এমন দৃশ্য কোনও দিন দেখতে পাব কিনা!

ফেরার পথে কুনকি হাতিদের স্নান করাচ্ছিল মাহুতরা। এদের পিঠে চেপেই জঙ্গল সাফারি হয় একদম ভোরে। দিনে একবার। পথে হলং বাংলোর সামনে দেখা মিল একদল ময়ূর এবং বাইসনের। গাছের ডালে পাখির কর্কষ ডাক চিনিয়ে দিয়েছিল ধনেশকে। আর জঙ্গল থেকে বেরনোর ঠিক আগে বার্কিং ডিয়ার। শোনা যায় বাঘ বা হিংস্র জন্তু এলে এরা কুকুকের মতো ডাক ছেড়ে সকলকে সতর্ক করে। তবে বাঘ বা লেপার্ড দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু যা দেখেছি তা কোনও দিন ভোলার মতো নয়।

রামপ্রসাদ বাবুর একটা কথা এখানে না বললেই নয়, 'আপনারা এত দূর থেকে জঙ্গলে আসেন পশুপাখি দেখার জন্য। আমরা যদি সেটা না দেখাতে পারি তবে তা আমাদের লজ্জা। এটা সকলেই জানেন পশুপাখি নিজেদের মর্জির মালিক। চিড়িয়াখানা তো নয় যে নির্দিষ্ট সময় খাবার খাবে, ঠিক সময় খাঁচায় ঢুকে ঘুমোবে। এটা জঙ্গল। তবুও গাইডের কর্তব্য জঙ্গলকে হাতের তালুর মতো চেনা। যাতে ঘুরতে আসা পর্যটক নিরাশ না হয়ে ফেরেন। এটাই আমাদের সার্থকতা।'

সার্থক আপনাদের প্রয়াস এবং সার্থক আপনাদের অধ্যবসায়। উত্তরবঙ্গের তিনটে জঙ্গল সাফারি করার পর এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের মাদারিহাট রেঞ্জের যে ব্যবস্থাপনা দেখেছি, তার কোনও তুলনা হয় না। যদি কেউ এ রাজ্যে পশুপাখি দেখতে চান, তাঁরা নিঃসন্দেহে জলদাপাড়ার টিকিট কেটে ফেলুন।

Advertisement

 

ছবি তুলেছেন রজত কর্মকার

 

POST A COMMENT
Advertisement