কার্শিয়াঙে হেরিটেজ ট্যুরিজমের নয়া দিশা, ট্রয় ট্রেনের সঙ্গে হাত মেলাল চা বাগানডুয়ার্স বা পাহাড় মানেই কি শুধু ছাঙ্গু আর ঘুম? সেই একঘেয়েমি কাটাতে এবার পাহাড়ের বুক চিরে নয়া ‘স্লো ট্যুরিজম’ বা ধীরগতির পর্যটন সার্কিট চালু হলো কার্শিয়াঙে। বুধবার দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (DHR) এবং রেলওয়ে হেরিটেজের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হলো এক বিশেষ ‘ফ্যাম ট্যুর’। যার পোশাকি নাম, ‘টি অ্যান্ড টিম্বার ট্রেইলস’। রেলকর্তা থেকে শুরু করে দেশের তাবড় ট্রাভেল এজেন্টরা এদিন পাহাড়ি পথের হেরিটেজ হিরে জহরত খুঁটিয়ে দেখলেন।
দিনের শুরুটা হয়েছিল সুকনা স্টেশন থেকে। সেখানে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা ফটো গ্যালারির দ্বারোদ্ঘাটন করেন প্রতিনিধিরা। এরপর ঐতিহ্যের সওয়ারি হওয়া। এভারেস্ট কোচ, ডাইনিং কোচ আর ফার্স্ট ক্লাস বডি নিয়ে ট্রয় ট্রেন পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে এগিয়ে চলল রংটং স্টেশনের দিকে। ট্রেনের ঝকঝকানি আর পাহাড়ের সবুজে মোড়া সেই সফর ছিল আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয়।
রংটং পৌঁছানোর পর প্রতিনিধিদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো কার্শিয়াং বনবিভাগের অধীনে থাকা শিবখোলা ‘বার্ডিং হটস্পট’-এর সঙ্গে। হরেক প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর এই এলাকাটি আগামী দিনে পক্ষীপ্রেমীদের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকৃতির কোল ঘেঁষে এই পথ চলা প্রতিনিধিদের মুগ্ধ করেছে।
এরপর পর্যটন সার্কিটটি বাঁক নিল সিপাহীধুরা চা বাগানের দিকে। সেখানে নেপালি লোকনৃত্যের তালে প্রথাগত অভ্যর্থনা জানানো হয় অতিথিদের। কেবল নাচ-গান নয়, চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে চা পাতা তোলা এবং কারখানায় গিয়ে চা তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার পাঠ নিলেন প্রতিনিধিরা। বাগানের সবুজ গালিচায় মধ্যাহ্নভোজের আসর ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
দুপুরের পর গন্তব্য ছিল ঐতিহাসিক তিনধারিয়া ডিএইচআর ওয়ার্কশপ। ১৪০ বছরের পুরনো রেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই জীবন্ত দলিল দেখে অবাক রেলকর্তারাও। কীভাবে আজও সাবেকি পদ্ধতিতে ট্রয় ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তা চাক্ষুষ করলেন তাঁরা। এই ওয়ার্কশপটি যে নিজেই একটি বড় পর্যটন আকর্ষণ হতে পারে, সে বিষয়ে সকলেই একমত।
পুরো দিনের এই সফরের ইতি ঘটল মার্গারেট’স ডেকে এক সান্ধ্য আসরে। সেখানে পর্যটন ব্যবসায়ী ও রেল আধিকারিকরা দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রাভেল এজেন্টরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, এবার থেকে দার্জিলিং ও উত্তর-পূর্ব ভারতের প্যাকেজে তাঁরা ডিএইচআর-এর হেরিটেজের সঙ্গে চা ও অরণ্যের এই ‘যুগলবন্দি’কে অবশ্যই ঠাঁই দেবেন।
পর্যটন ব্যবসায়ী রাজ বসুর মতে, যখন দক্ষিণবঙ্গ ভোটে ব্যস্ত, তখন উত্তরবঙ্গ মেতেছিল হেরিটেজ ও কমিউনিটি ট্যুরিজমের প্রসারে। দার্জিলিং ব্র্যান্ডকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই উদ্যোগ মাইলফলক হয়ে থাকবে। জিটিএ (GTA) এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ট্যুরিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এই কর্মযজ্ঞে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
পাহাড়ের এই নতুন সার্কিট কেবল পর্যটক টানবে না, কর্মসংস্থান জোগাবে স্থানীয়দেরও। ট্রয় ট্রেনের ধীরগতি আর বনের নিস্তব্ধতা— দুই মিলিয়ে দার্জিলিং হিমালয়ান মডেল এবার টেকসই পর্যটনের নতুন দিশা দেখাচ্ছে। কার্শিয়াং এখন কেবলই একটি স্টেশন নয়, বরং এক পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।