কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব প্রয়োগ, এটাই ভারতের ইজরায়েল নীতি

বর্তমানে ভারত–ইজরায়েল সহযোগিতা প্রতিরক্ষা, কৃষি, জল প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। রয়টার্সে প্রকাশিত SIPRI তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইজরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী। বারাক-৮ এয়ার ডিফেন্স মিসাইল এবং হেরন ইউএভি-এর মতো ব্যবস্থা ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সম্পৃক্ততার পাশাপাশি আরব দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের সমানভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।

Advertisement
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব প্রয়োগ, এটাই ভারতের ইজরায়েল নীতিকৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব প্রয়োগ, এটাই ভারতের ইজরায়েল নীতি


ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততাকে প্রায়ই বৈশ্বিক মেরুকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় বিদেশনীতির মূল নীতিকে উপেক্ষা করে—জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ভারত ১৯৫০ সালেই ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। তবে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। এই ৪২ বছরের ব্যবধান দ্বিধার নয়, বরং সুচিন্তিত ভারসাম্যের প্রতিফলন। ঐতিহাসিকভাবে ভারত সংবেদনশীলতা, বাস্তববাদ এবং পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তার পশ্চিম এশিয়া নীতি পরিচালনা করেছে—যা বিদেশ মন্ত্রকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

বর্তমানে ভারত–ইজরায়েল সহযোগিতা প্রতিরক্ষা, কৃষি, জল প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। রয়টার্সে প্রকাশিত SIPRI তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইজরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী। বারাক-৮ এয়ার ডিফেন্স মিসাইল এবং হেরন ইউএভি-এর মতো ব্যবস্থা ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সম্পৃক্ততার পাশাপাশি আরব দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের সমানভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।

সমগ্র অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (CEPA) পর ২০২২–২৩ সালে ভারত–সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বাণিজ্য ৮৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। সৌদি আরব ভারতের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ৮ মিলিয়নের বেশি ভারতীয় বসবাস ও কাজ করেন এবং প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। এই পরিসংখ্যান একটি সহজ বাস্তবতা তুলে ধরে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ভারতকে প্রতিরক্ষা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে দেয়, একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং প্রবাসী সম্পর্ক আরও গভীর করতে সক্ষম করে। এটি ভারতকে প্যালেস্তাইনের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে এবং রাষ্ট্রসংঘে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করতে সহায়তা করে।

ভারতের বিদেশনীতি মতাদর্শভিত্তিক নয়, এটি স্বার্থনির্ভর এবং বিষয়ভিত্তিক
বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং রাইসিনা ডায়ালগের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার এই নীতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ভারত জোট নয়, অংশীদারিত্ব চায়। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। জোট মানে নির্দিষ্ট অবস্থানের সঙ্গে বাধ্যতামূলক সামঞ্জস্য। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। ভারত ড্রিপ সেচ এবং জল পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তিতে ইজরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করছে, কারণ এটি ভারতীয় কৃষকদের উপকার করে। এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কর্মীর জীবিকা রক্ষা করতে সম্পৃক্ত রয়েছে। এটি I2U2-এর মতো বহুপাক্ষিক গোষ্ঠীতে অংশগ্রহণ করছে, কারণ এগুলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ায়। এই সম্পৃক্ততাগুলোর কোনোটি অন্যটিকে দুর্বল করে না। বরং, প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ভারতের সক্ষমতা তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। আঞ্চলিক সংকটের সময় ভারত ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা হ্রাস, অসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে—যা সরকারি বিবৃতি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কোনো দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান নয়। এটি কৌশলগত স্বচ্ছতা। এটি স্বীকার করে যে বহুমেরু বিশ্বে সার্বভৌমত্ব মানে বাহ্যিক চাপ বা মতাদর্শিক প্রভাব নয়, বরং জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তাই ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা তার ভারসাম্যপূর্ণ পশ্চিম এশিয়া নীতির বিচ্যুতি নয়। এটি সেই নীতিরই একটি সম্প্রসারণ। যেখানে স্বার্থের মিল আছে সেখানে সম্পৃক্ত হও। মানবিক নীতিকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করো। সর্বদা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ বজায় রাখো। এটাই বাস্তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।

Advertisement

POST A COMMENT
Advertisement