আবু হাসেম খান চৌধুরী প্রয়াতযাঁরা কোনওদিন কোতোয়ালির বাড়িতে যাননি, তাঁরা কি গণি 'মিথ' বুঝতে পারবেন? আমার ৩০ পেরোনো সাংবাদিক জীবনে যতবার মালদা শহরের উপকণ্ঠে কোতোয়ালির বাড়িটার সামনে গিয়ে পৌঁছেছি, ততবার এই প্রশ্নটা মাথায় এসেছে। বুধবার গভীর রাতে কলকাতা ফেরার সময় যখন আবার ডালুদা ওরফে আবুল হাসেন খান চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ পাওয়ায় আবার সেই কথাটাই মনে পড়ে গেল। দাদা বরকত গণি খান চৌধুরী বাংলার রাজনীতিতে এমন একটা 'মিথ' তৈরি করিয়েছিলেন, যে 'মিথ'কে ভাঙিয়ে তাঁর ভাই ডালুদা টানা দশ বছর বিধায়কি ছিলেন, তারপর দীর্ঘদিন সাংসদ।
ডালুদার রাগের স্বভাবটা ছিল কম
এমনকী ইউপিএ মন্ত্রিসভায় তিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন। দাদার তুলনায় মিতভাষী এবং নরম মনের মানুষ ডালুদার সুযোগ্য পুত্র ঈশা খান চৌধুরী। বরকতদা যেমন রেগে যেতেন, ডালুদার রাগের স্বভাবটা ছিল কম। আরও কম বোধহয় তাঁর পুত্র ঈশার মধ্যে। প্রবল অস্বস্তিকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেও দেখেছি ঈশা কখনও রাগেন না। তাই বুধবার গভীর রাতে যখন তাঁর মৃত্যু সংবাদ এলো, তখন ঈশা নয়, তাঁর বোন তথা শ্যালিকা মৌসম বেনজির নুরের প্রতিক্রিয়া দেখেই মনে হচ্ছিল পরিবারটা সেই একইরকম রয়ে গেছে। ভীষণরকম 'এলিট', আবার ভীষণরকম নিজেদের জন্য একটা দেওয়াল তুলে রাখতে বদ্ধপরিকর।
আদ্যোপান্ত সাহেব মানুষ ছিলেন
কোতোয়ালির বাড়িতে গেলে যে মার্সিডিজটা চোখে পড়ে, সেই মার্সিডিজটায় এক সময় চড়তেন বাংলার রাজনীতির অবিসংবাদিত চরিত্র বরকত গণি খান চৌধুরী, যাঁকে নিয়ে বিতর্ক যতটা, ততটাই তাঁর রাজনীতির শিকড় গভীরে। শিকড় গভীরে বলেই তো বরকত গণি খান চৌধুরী মারা যাওয়ার পরেও অনায়াসে ডালুদা মালদার রাজনীতিতে রাজত্ব করলেন এবং তারপরে ঈশাও পৌঁছে গেলেন লোকসভায়। আর এবারেও মালদার বিধানসভায় কংগ্রেসের প্রধান পুঁজি ঈশা এবং তাঁর বোন মৌসম বেনজির নুরের যুগলবন্দি। বরকত দা এবং ডালুদার বোন রুবি নুরের মেয়ে মৌসম। কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে গিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন। আবার সেই সাংসদ পদ ছেড়ে মিতবাক মৌসম ফিরে এসে এবার মালদা থেকেই কংগ্রেসের প্রার্থী। কিন্তু ফিরে আসা যাক ডালুদার কথায়। যাঁরা কোতোয়ালির বাড়িতে কখনও গেছেন, তাঁরা বুঝবেন যে, ডালুদাও আদ্যোপান্ত সাহেব মানুষ ছিলেন। তাঁর বিদেশিনী বউ, তাঁর বিদেশে দীর্ঘদিন কাটানোর অভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি ওই অভিজাত পরিবারের জীবন এবং যাপনের ঐতিহ্য ডালুদা ভীষণভাবে বহন করতেন। বরকত দা যেমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত ছিলেন, আমার পরিচিত রন্তিদেব সেনগুপ্ত যে গল্পটা প্রায়ই বলেন, বাবরি মসজিদ ভাঙার পর বরকত দা মালদার মুসলিম প্রধান গ্রামে ঘুরে ঘুরে যেন কোনও দাঙ্গা না লাগে, সেটা দেখতে সচেষ্ট ছিলেন, তেমনই ডালুদার মধ্যেও সেই একই মেজাজ ছিল। আমার নিজের ধারণা ঈশা এবং তাঁর স্ত্রীও ওই ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে বহন করেন।
দাদাকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো যোগ্যতা বা ইচ্ছা কোনওটাই তাঁর ছিল না
ভারতবর্ষে যে-কোনও সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে ওঠাটা যতটা কঠিন, আবার বরকত গণি খান চৌধুরীর মতো যদি আপনি কিংবদন্তি হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে ততটাই সহজ। এই যে 'কমিউনিটি লিডার' বা সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে ওঠা, সেটা ডালুদাও পেরেছিলেন। দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ সব জেলার নেতারা তাঁর কাছে আসতেন কোনও না কোনও সাহায্যের আশায়। এবং যতটুকু টুকরোটাকরা গল্প শুনতাম ডালুদা সবার কাজই করে দিতেন বিনা দ্বিধায়। এটা শুধু আমি মুসলিমদের কথা বললাম। কিন্তু নিজের সম্প্রদায়ের বাইরে গিয়ে মালদার মানুষের জন্য যেমন বরকত গণি খান চৌধুরী ভেবেছিলেন, তেমনই ডালুদাও তাঁর মতো করে চেষ্টা করেছিলেন। অবশ্যই দাদাকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো যোগ্যতা বা ইচ্ছা কোনওটাই তাঁর ছিল না। কিন্তু কোতোয়ালির বাড়ির মেজাজ এবং কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য যেটুকু দরকার ছিল, সেটুকু আবু হাসেম খান চৌধুরীর মধ্যে ছিল। বুধবার কলকাতার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু তাই হয়তো একটা যুগের উপর যবনিকা পতন ঘটাল, যে যুগে রাজনীতিটা শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের বিষয় ছিল না; বরং অনেক কিছু মানুষকে দেওয়ার জন্য এই ধরনের পুরোনো অভিজাত পরিবারগুলি রাজনীতিতে আসত।