
পণ্ডিত শিবকুমার শর্মাপাইনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ঝিলের জলের কলকাকলি শুনেছেন কখনও? তা হলে আন্দাজ করতে পারবেন সঙ্গীতের এই মহান রঙ্গশালায় সন্তুর ঠিক কী? তরঙ্গের উপর অনবরত খেলে চলে। প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির সঙ্গে আপনার সাক্ষাত্ ঘটাবে। দুঃখের বিষয়, এই স্বর্গীয় অনুভূতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সেই শিল্পী আজ আমাদের মধ্যে নেই। একমাত্র অনুরণন হল নক্ষত্র থেকে নির্গত ঝনঝনানি, যা কানে জলপ্রপাতের মতো প্রবাহিত অমৃতের স্রোতের মতো।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সন্তুরের কাহিনি ৬০-৭০ বছরের পুরনো। সন্তুর, অর্থাত্ শত-তন্ত্রী বীণা। ১০০টি তারের একটি বাদ্যযন্ত্র। ভারতের কাশ্মীরে জন্ম। ঠিক সেই কারণেই, এই বাদ্যযন্ত্রের গঠন, স্বভাব ও ধ্বনি আপনাকে উপত্যকার সফর করায়। সন্তুর শোনা আর তপবনে হেঁটে বেড়ানোর অনুভূতি একই। ঘূর্ণায়মান জলপ্রপাত, ঢেউয়ের ঢেউ, দমকা বাতাস,পাইনের বন, আখরোট, দেবদারু আর পাইন, প্রতিধ্বনি আর কিচিরমিচির শিশু, ভেড়া ও গরুর পাল থেকে পাখি... সন্তুরের সুরে অনেক ছবি।
তাই সন্তুরের জন্মের কৃতিত্ব লোকসঙ্গীতকে দিলে অত্যুক্তি হয় না। ভারতে সঙ্গীতে সবচেয়ে বড় দিক হল, এই ভূখণ্ডে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি লোকসঙ্গীতের বিস্তারও সমান ভাবে ব্যাপক। এই লোকপরম্পরাই ভারতীয় সঙ্গীত জগতকে সন্তুর উপহার দিয়েছে। সন্তুর কিন্তু শুধুমাত্র কাশ্মীর বা ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। সন্তুরের মতোই কিছু বাদ্যযন্ত্র রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, চিন, গ্রিস ও ইরানে রয়েছে। কাশ্মীরের সন্তুরের সঙ্গে সুফি সঙ্গীত অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সুফি ও ফকিরদের সঙ্গীতে জুড়ে যায় সন্তুর। পরে তার আরও বিস্তার ঘটে।

কাশ্মীর সম্পর্কে বিশেষ বিষয় হল এই অঞ্চলটি আসলে বহু শতাব্দী ধরে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের একটি সংযোগস্থল ছিল। তাই কাশ্মীরের সংস্কৃতিতে একাধিক সভ্যতার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সুফি সঙ্গীতের ভারত ভূমিতে আগমনের পরে যে ভাবে বিস্তার হয়েছে, সন্তুর সেই পরম্পরারই একটি বাহক।
সন্তুরের মহান সাধক
পন্ডিত শিবকুমার শর্মা না জন্মালে বোধ হয় উপত্যকাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতো সন্তুর। শিবকুমারের বাবা ঊমা দত্ত শর্মা ছিলেন বিখ্যাত গায়ক ও তবলাবদক। কিন্তু শিবকুমার মাত্র ৫ বছর বয়সেই সন্তুরের সাধনা করবেন ঠিক করেন। দিনরাত সাধনার নির্যাস, মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে পারফর্ম।
সন্তুরের সঙ্গে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিলেন শিবকুমার। আজ ১৭ বছর আগে দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির পরে উনি আমায় বলেছিলেন, 'সন্তুরকে শাস্ত্রীয় ঘরানার একটি সদস্য করে তোলা চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু এরকম কোনও সঙ্কল্প ছিল না যে সন্তুরকে শাস্ত্রীয় করে তুলতেই হবে। লক্ষ্যও ছিল না। আসলে আমি সন্তুরকে ভালবেসেছি। সন্তুরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রয়োগ করার জন্য সুফি স্কুল থেকে একটু বেরনোর দরকার ছিল। কিছু বদলের দরকার ছিল। তাই যেভাবে প্রয়োগ করা শুরু করলাম, শিখতে করলাম, সেই গতিতে আমার ও সন্তুরেরও বদল ঘটতে শুরু করল।
উপত্যকার গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশে সন্তুরের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল। শিবকুমার শর্মার সবচেয়ে জমজমাট পারফর্ম্যান্সগুলির মধ্যে একটি হল পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার সঙ্গে ডুয়েট। বাঁশির সঙ্গে সন্তুরের শব্দের মেলবন্ধন যেন এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেল সঙ্গীতকে।
কাশ্মীরের শিবকুমার ও এলাহাবাদের হরিপ্রসাদের ওই মহান জুটি ভেঙে গেল। শিবকুমার শর্মার সন্তুরের আওয়াজ থেমে গেল। যদিও ওঁর পুত্র রাহুল শর্মা পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। আরও আধুনিক করার জন্য নানা পরীক্ষাও করছেন।